ঠাকুরগাঁওয়ে জুয়ার আসরে ৪ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
ঠাকুরগাঁওয়ে জুয়ার আসরে ৪ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের কাছেই একটি টিনশেড ঘরে নিয়মিত জুয়ার আসর বসার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানের সময় জুয়াড়িদের পালানোর চেষ্টা এবং পুলিশের বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) জুয়েল রানা আহত হয়েছেন। তার ডান হাতের একটি আঙুল ভেঙে যাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

সোমবার গভীর রাতে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হলপাড়ায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়সংলগ্ন একটি টিনশেড কক্ষে এ অভিযান চালানো হয়। পুলিশের দাবি, ওই কক্ষে বেশ কিছুদিন ধরে নিয়মিত জুয়ার আসর বসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে জুয়া খেলার সঙ্গে জড়িত চার পুলিশ সদস্যকে আটক করা হয়। অভিযানের খবর পেয়ে আরও দুই পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে জানানো হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে কর্মরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শান্তি কুমার রায়, কনস্টেবল মো. সোহেল রানা, কনস্টেবল আলমগীর কবির এবং সদর ফাঁড়িতে কর্মরত এএসআই মো. শাহাদত জামান। তাদের বয়স যথাক্রমে ৩৭, ৩৩, ৩৩ ও ৩৯ বছর বলে পুলিশ জানিয়েছে।

অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে থাকা পঞ্চগড় জেলা পুলিশের এটিএসআই আতাউর রহমান এবং পিবিআই ঠাকুরগাঁওয়ের কনস্টেবল শহিদুল ইসলাম পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদেরও এই ঘটনায় সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাতে সদর থানার টহল দলের কাছে খবর আসে যে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের কাছাকাছি একটি টিনশেড ঘরে জুয়ার আসর বসেছে। খবর পাওয়ার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আলমগীর রহমান এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) জুয়েল রানার নেতৃত্বে একটি দল সেখানে অভিযান পরিচালনা করে।

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা ব্যক্তিরা দ্রুত পালানোর চেষ্টা করেন। তাদের আটকে দিতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে উপস্থিত ব্যক্তিদের ধাক্কাধাক্কি ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জুয়েল রানা আহত হন। পরে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আঘাতের কারণে তার ডান হাতের একটি আঙুল ভেঙে গেছে।

অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে চার পুলিশ সদস্যকে আটক করা হয়। সেখানে তাস, জুয়ার বোর্ডে থাকা নগদ টাকা এবং কয়েকটি স্মার্টফোন পাওয়া যায়। পাশাপাশি টিনশেড কক্ষটির আশপাশ থেকে চারটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঘটনাটি শুধু জুয়া খেলার অভিযোগে কয়েকজন ব্যক্তিকে আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পুলিশের সদস্যদেরই এমন একটি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেদের আচরণ ও আইন মেনে চলার বিষয়ে যে উচ্চতর প্রত্যাশা থাকে, সেই প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক তদন্ত ও অভিযানের সময় পাওয়া আলামতের ভিত্তিতেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক দুই পুলিশ সদস্যের বিষয়ে তদন্ত করে তাদের অবস্থান শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এ ঘটনায় ঠাকুরগাঁও সদর থানায় মামলা করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. লিখন হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় ২০২৬ সালের জুয়া প্রতিরোধ আইনের ১৫ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩২৩ ও ৩২৫ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। ধারা অনুযায়ী জুয়া খেলার অভিযোগের পাশাপাশি অভিযানের সময় সংঘটিত ধাক্কাধাক্কি ও আঘাতের বিষয়টিও মামলার আওতায় আনা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুজিত কুমার পাল জানিয়েছেন, অপরাধের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। গ্রেপ্তার চারজনকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং পলাতক দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন জানিয়েছেন, ঠাকুরগাঁওয়ে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে পুলিশের কিছু সদস্যের জুয়া খেলায় জড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল। পরে তথ্য যাচাই-বাছাই করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সাধারণ অপরাধীদের বিরুদ্ধে যেভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বাহিনীর সদস্য হওয়াকে কোনো ধরনের ছাড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে হস্তান্তরের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

স্থানীয়দের কাছে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি স্থাপনার পাশে নিয়মিত জুয়ার আসর বসার অভিযোগও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের আশপাশে নিরাপত্তা ও নজরদারি থাকার কথা। সেখানে এমন কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগ ওঠায় সংশ্লিষ্ট স্থানে নজরদারি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে সেটি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আস্থা, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং আইনের সমান প্রয়োগ—তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ঠাকুরগাঁওয়ের এই ঘটনায় এখন মূলত তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে নজর রয়েছে। গ্রেপ্তার চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে কীভাবে উপস্থাপিত হয়, পলাতক দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় কি না এবং তদন্তে আর কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় কি না—এসব বিষয় পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া নগদ টাকা, তাস, স্মার্টফোন ও মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত তদন্তে কী তথ্য দেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাহিনীর সদস্য হলেও অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তা নির্ভর করবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর। আপাতত চার পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার এবং আরও দুই সদস্যের সন্ধানে অভিযান চলার মধ্য দিয়ে ঘটনাটির আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত