জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের নিয়ে তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি রওনা হন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই তাঁর প্রথম অংশগ্রহণ এবং আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, সরকারের অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় উঠে আসবে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এবারের সফরে জাতিসংঘের মূল অধিবেশনের পাশাপাশি একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও বিভিন্ন পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে যাত্রার পর তুর্কি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি প্রায় আট ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের যাত্রা শেষে ইস্তাম্বুলে পৌঁছানোর কথা। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের ট্রানজিট শেষে ফ্লাইটটি নিউইয়র্কের উদ্দেশে আবার যাত্রা করবে। নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম অভ্যর্থনা জানাবেন। পরে মোটরশোভাযাত্রার মাধ্যমে তাঁকে তাঁর অবস্থানস্থলে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বিদায়ের সময় বিমানবন্দরে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। সফরকে কেন্দ্র করে সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করার সুযোগকে সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সফরের প্রথম পর্যায়ে ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এরপর তিনি অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেবেন। একই দিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে আয়োজিত একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।

২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক মানবিক ও দাতব্য সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওই বৈঠকে বৈশ্বিক বৈষম্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে। একই দিনে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায়সংগত উত্তরণবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো ঝুঁকির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো তুলে ধরে আসছে। এবারের সফরেও এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটও প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থাকছে। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। সেখানে মিয়ানমারে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরার কথা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকট বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত চাপ তৈরি করে আসছে।

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এটি সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশ্বমঞ্চে তাঁর প্রথম বক্তব্য। সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনায় আসার কথা রয়েছে।

সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনের বাইরে ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বের হুমকি নিয়ে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হওয়ায় এ আলোচনায় দেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকবে।

একই দিনে বাংলাদেশ আয়োজিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব-অনুষ্ঠানেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। এর মধ্যে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং ধাত্রীবিদ্যা সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো তুলে ধরা হতে পারে।

জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে কয়েকটি দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কর্মসূচিও রয়েছে। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব আলোচনায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে। আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়েও এসব বৈঠকে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবেও এবারের সফরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিউইয়র্কে মেটা, ওয়াল স্ট্রিট এবং কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠনের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা রয়েছে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, শিল্প ও অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে এসব আলোচনায় মতবিনিময় হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এবারের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের আকারও আগের অনেক সফরের তুলনায় ছোট রাখা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সদস্য, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা প্রতিনিধিদলে রয়েছেন। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন।

এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কারণে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে একই সময়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণ দেশের কূটনৈতিক তৎপরতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তৈরি করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে কয়েক দিন ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেবেন তিনি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বনেতাদের জন্য নিজ নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ। ফলে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ এবং সফরকেন্দ্রিক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকগুলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করছে। এখন নজর থাকবে ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণ এবং সফরকালে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোর ফলাফল ও পরবর্তী কূটনৈতিক কার্যক্রমের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত