প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক সফরের শুরুতেই ব্যস্ত সময় পার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম দিনের নির্ধারিত কর্মসূচিগুলোর মধ্যে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার, রোহিঙ্গা সংকট, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দিনের কর্মসূচি ছিল মূলত জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগকেন্দ্রিক। সফরের শুরুতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নেন। এরপর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা সংকট ও পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বৈশ্বিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ, টেকসই উন্নয়ন এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্বনেতাদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও উন্নয়ন, জলবায়ু ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো সামনে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রথম দিনের দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মধ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব পায়। বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের বিদ্যমান সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। তুরস্কের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশটি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হয়। সার্ক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ, পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনার পরিধিতে ছিল। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও কার্যকর করার সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।
হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ের ফিলস-আইমের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাইতির চলমান অস্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হয়। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জন্য কীভাবে কাজে লাগতে পারে, সেই বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পায়।
রোহিঙ্গা সংকটও প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় সংকটটির স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আয়োজিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-আয়োজনেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব করার ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগও রয়েছে। সফরসূচি অনুযায়ী মেটাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ থাকছে। সরকারি পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও এ সফরের কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর সফর শুধু আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এটি জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বক্তব্য হবে। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে বলে সফরের পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে জানানো হয়েছে।
এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন এবং ২২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় নিউইয়র্কে পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানসহ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা রয়েছেন। সফরকালে জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান ছাড়াও একাধিক দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সূচি রয়েছে।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দিনের কার্যক্রমে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক অগ্রাধিকারগুলো একাধিক আলোচনায় উঠে এসেছে। নিউইয়র্কে পরবর্তী কর্মসূচিতে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আরও বিস্তৃতভাবে আলোচিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বনেতাদের এই সমাবেশে বাংলাদেশের অবস্থান ও প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের সুযোগও কাজে লাগাতে চাইছে ঢাকা।