প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে যখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তখন পণ্যমূল্যে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য বাজারে কঠোর নজরদারি করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পর বিভিন্ন বাজারে মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—দুই পক্ষের মধ্যেই এর প্রভাব নিয়ে নানা ধরনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগান ফ্যাক্টরি মাঠে চা-শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যেন পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে না পারেন, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি জানান।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের বড় অংশই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটায় ব্যয় হয়। পরিবহন খরচ, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় এবং উৎপাদন খরচের সঙ্গে জ্বালানি মূল্যের সম্পর্ক থাকায় তেলের দাম বাড়লে বাজারে তার কিছুটা প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ার খবরও পাওয়া গেছে। তবে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধি এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও বাণিজ্যমন্ত্রী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে জ্বালানি খরচের সম্পর্ক থাকলেও পণ্যের দামে খুব বেশি প্রভাব পড়ার কথা নয়। উৎপাদন ব্যয়ের কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা সীমিত থাকার কথা তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা এবং মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা ঠেকানো। বাণিজ্যমন্ত্রী এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি জোরদারের কথা বলেছেন। ব্যবসায়ী সংগঠন, আমদানিকারক, উৎপাদক এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করার কথা জানানো হয়েছে
এদিকে সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানে অনুষ্ঠিত রেইনকোট বিতরণ কর্মসূচিতে চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন চা-বাগানের ১ হাজার ৯৮০ শ্রমিকের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ করা হয়। বর্ষাকালে চা-বাগানের শ্রমিকদের মাঠপর্যায়ে কাজ করার সময় বৃষ্টির মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে তাদের দৈনন্দিন কাজে রেইনকোটের মতো সুরক্ষা সামগ্রী প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এ ধরনের সহায়তা শ্রমিকদের কর্মপরিবেশে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, চা-বাগানের আয় বাড়ানোর জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। চা-বাগানগুলোকে আরও লাভজনক করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বৈঠক হয়েছে বলেও তিনি জানান। চা-গাছের উৎপাদন ও স্বাস্থ্য যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বাগানের খালি জায়গায় অতিরিক্ত আয়ের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। কাঠজাতীয় গাছ ও মসলাজাতীয় গাছ লাগানোর বিষয়টি এ আলোচনার মধ্যে রয়েছে।
চা-বাগানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিকল্প আয়ের উৎস তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে। যেসব চা-বাগানে বাস্তবসম্মত সুযোগ রয়েছে, সেখানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এর মাধ্যমে বাগানের পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ভাবা হচ্ছে।
চা-শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও কয়েকটি পরিকল্পনার কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, চা-বাগানের শ্রমিকদের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যেসব বাগানে এখনো স্কুল নেই, সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বাগানের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট সংস্কারের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চা-শ্রমিকদের পরিবারগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা তৈরি হতে পারে।
সিলেটের চা-বাগানগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় জনজীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, যোগাযোগ এবং আয় বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে তাদের প্রত্যাশা রয়েছে। ফলে নতুন পরিকল্পনাগুলো কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও মন্তব্য করেন। আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচিত বিরোধী দলের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত এবং মুখরোচক বক্তব্যের পরিবর্তে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। তাঁর এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে তাঁর অবস্থান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব বক্তব্য ও অবস্থান ভিন্ন হতে পারে।
লাক্কাতুরার অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ জোসেন চৌধুরীসহ রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর আগামী দিনগুলোতে বাজার পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল থাকে, সেটি নির্ভর করবে পণ্যের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, আমদানি ব্যয় এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের ওপর। সরকারের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ এবং বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই ভোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের প্রকৃত ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ করা হলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সীমিত রাখার সরকারের লক্ষ্য বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।