প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হিমালয়ের একটি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তান ও চীন যৌথভাবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চালু করায় ভারত তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। পাকিস্তান ও চীন গত সপ্তাহে পাকিস্তান-চীন সীমান্ত যৌথ কমিশন কার্যকর করার পর দিল্লি বলেছে, এই কমিশনের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং ভারতের দাবিকৃত ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণকে তারা স্বীকৃতি দেয় না।
ইসলামাবাদে ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর কমিশনের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান ও চীনের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ জরিপ, বাণিজ্য ও মানুষের চলাচল এবং সীমান্তসংলগ্ন যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কমিশনটি একটি নিয়মিত সমন্বয় কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। পাকিস্তান এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে।
তবে ভারতের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু শুধু নতুন কমিশন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের পুরোনো ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের বিরোধ। বিশেষ করে শাকসগাম উপত্যকা নিয়ে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের অবস্থান পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতের মতে, শাকসগাম উপত্যকা জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ এবং পাকিস্তান ১৯৬৩ সালে ওই এলাকার একটি অংশ চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল। ভারত ওই চুক্তিকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, দিল্লির অবস্থান এ বিষয়ে স্পষ্ট ও ধারাবাহিক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত পাকিস্তান ও চীনের তথাকথিত যৌথ সীমান্ত কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করছে এবং ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিকেও ভারত স্বীকৃতি দেয় না। দিল্লির দাবি, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এসব অঞ্চলের বিষয়ে পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশ এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না, যা ভারতের অবস্থানকে প্রভাবিত করে।
এই বিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শাকসগাম উপত্যকা। কারাকোরাম পর্বতমালার বিস্তৃত ও দুর্গম এলাকায় অবস্থিত এই অঞ্চলটি ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন ও পাকিস্তানের সংযোগস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ওপর চীনের সঙ্গে ব্যবস্থা করেছিল বলে ভারতের সরকারি অবস্থানে উল্লেখ করা হয়। পাকিস্তান ওই চুক্তিকে বৈধ বলে মনে করে, কিন্তু ভারত এর বৈধতা অস্বীকার করে।
পাকিস্তানের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। ইসলামাবাদের দৃষ্টিতে জম্মু ও কাশ্মীর একটি বিতর্কিত অঞ্চল এবং ১৯৬৩ সালের চুক্তির মাধ্যমে চীনের সঙ্গে যে সীমান্তব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেটি তাদের দৃষ্টিতে বৈধ। ফলে পাকিস্তান ও চীন তাদের পারস্পরিক সীমান্ত সম্পর্ক পরিচালনার জন্য নতুন কমিশনকে একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক কাঠামো হিসেবে দেখছে।
নতুন কমিশন গঠনের বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এটি সরাসরি নতুন করে কোনো ভূখণ্ড ভাগ করার চুক্তি নয়; বরং পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান সীমান্ত সম্পর্ক পরিচালনা ও সমন্বয়ের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এর আওতায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ জরিপ, সীমান্তচিহ্ন পর্যবেক্ষণ, সীমান্ত পারাপার, বাণিজ্য এবং যোগাযোগের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করার কথা রয়েছে।
তবু ভারতের উদ্বেগের জায়গা এখানেই। দিল্লির দৃষ্টিতে পাকিস্তান-চীন সীমান্ত হিসেবে যে অঞ্চলকে দুই দেশ পরিচালনা করছে, তার একটি অংশ ভারতের দাবিকৃত ভূখণ্ডের মধ্যে পড়ে। ফলে সেখানে দুই দেশের যৌথ ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হলে ভারতের আপত্তি আরও দৃঢ় হয়। ভারতের আশঙ্কা হলো, দীর্ঘ সময় ধরে এমন প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থা চালু থাকলে বিতর্কিত ভূখণ্ডের ওপর একটি বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যদিও ভারত সেই ব্যবস্থাকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয় না।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত ও চীনের মধ্যেও হিমালয় সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা রয়েছে। লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা ঘিরে দুই দেশের মধ্যে কয়েক বছর ধরে সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি ও বেইজিং সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করলেও সীমান্ত বিরোধের মৌলিক সমাধান এখনো হয়নি।
ফলে পাকিস্তান ও চীনের সীমান্ত সহযোগিতাকে ভারতের জন্য শুধু দ্বিপক্ষীয় পাকিস্তান-চীন বিষয় হিসেবে দেখা কঠিন। কারণ শাকসগাম উপত্যকা বৃহত্তর লাদাখ ও কারাকোরাম অঞ্চলের ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একদিকে ভারত ও পাকিস্তানের কাশ্মীর বিরোধ, অন্যদিকে ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধ—দুটি আলাদা বিরোধ একই ভৌগোলিক অঞ্চলে এসে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এই অঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে করিডোরটি গুরুত্বপূর্ণ। কারাকোরাম মহাসড়কসহ বিভিন্ন যোগাযোগ অবকাঠামো দুই দেশের উত্তরাঞ্চলকে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে সিপিইসির এমন অংশের বিরোধিতা করে আসছে, যেগুলো পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে গেছে বলে দিল্লি দাবি করে।
নতুন কমিশনের ফলে এই সীমান্ত এলাকায় বাণিজ্য, মানুষের চলাচল ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় আরও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাকিস্তান ও চীনের জন্য এর একটি বাস্তব অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। দুর্গম কারাকোরাম অঞ্চলে সীমান্ত বাণিজ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে নিয়মিত সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। কমিশন সেই সমন্বয়ের একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব রয়েছে। পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক বহু বছর ধরে প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, অর্থনীতি ও কূটনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার মাধ্যমে দুই দেশ তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্রকে নিয়মিত কাঠামোর মধ্যে আনছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এর মাধ্যমে চীন পাকিস্তানের সঙ্গে তার কৌশলগত অংশীদারত্বের ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতকে উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে নতুন কমিশন গঠনের ফলে সীমান্তে তাৎক্ষণিক সামরিক পরিবর্তন ঘটবে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, কমিশনের কার্যক্রম মূলত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগকেন্দ্রিক হওয়ায় এর তাৎক্ষণিক সামরিক প্রভাব সীমিত হতে পারে। বরং দীর্ঘমেয়াদে এর গুরুত্ব দেখা যেতে পারে প্রশাসনিক সমন্বয়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সীমান্তবর্তী যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ক্ষেত্রে।
এখানে ১৯৬৩ সালের চুক্তির প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ওই চুক্তিকে অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। পাকিস্তান বিপরীত অবস্থান নেয়। ফলে নতুন কমিশনের কার্যক্রম যতই প্রশাসনিক হোক না কেন, এর পেছনে থাকা সীমান্ত কাঠামোর বৈধতা নিয়ে তিন দেশের অবস্থান এক নয়।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান ও চীন যদি বিতর্কিত এলাকায় নিয়মিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জরিপ, যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে সেই কার্যক্রমকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। দিল্লি ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ ভারতের ভূখণ্ডগত দাবিকে পরিবর্তন করতে পারবে না।
অন্যদিকে পাকিস্তান ও চীন তাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার পথেই রয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন কেবল একটি সীমান্ত কমিশন গঠনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাশ্মীর, লাদাখ, কারাকোরাম, সিপিইসি এবং ভারত-চীন সম্পর্কের বৃহত্তর ভূরাজনীতি।
সব মিলিয়ে পাকিস্তান-চীন সীমান্ত যৌথ কমিশন কার্যকর হওয়ার তাৎপর্য মূলত তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের সংঘাতে। পাকিস্তান ও চীন এটিকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতা বাড়ানোর কাঠামো হিসেবে দেখছে। ভারত এটিকে এমন একটি ভূখণ্ড নিয়ে ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে, যার ওপর দিল্লির নিজস্ব সার্বভৌমত্বের দাবি রয়েছে। ফলে কমিশনটি সীমান্তে তাৎক্ষণিক কোনো নতুন বাস্তবতা তৈরি করুক বা না করুক, হিমালয়ের ভূরাজনীতিতে এর কূটনৈতিক গুরুত্ব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আগামী দিনে এই কমিশনের কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত হয়, সীমান্ত বাণিজ্য ও যোগাযোগে কী ধরনের পরিবর্তন আসে এবং ভারত এর জবাবে কী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়—এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে উদ্যোগটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। তবে আপাতত নিশ্চিত যে শাকসগাম উপত্যকা ও বৃহত্তর কারাকোরাম অঞ্চলকে ঘিরে ভারত-পাকিস্তান-চীনের বহুস্তরীয় বিরোধের নতুন একটি অধ্যায় সামনে এসেছে।