ভ্যাকসিন উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে ভারতের বড় উত্থান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
ভ্যাকসিন উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে ভারতের বড় উত্থান

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বৈশ্বিক সরবরাহের ক্ষেত্রে গত এক দশকে ভারতের সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেশটি এখন শুধু বিপুল পরিমাণে ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী হিসেবেই নয়, গবেষণা, উন্নত জৈবপ্রযুক্তি, ক্লিনিক্যাল সক্ষমতা এবং মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিং সম্প্রতি বলেছেন, পরিমাণের হিসাবে ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন উৎপাদক ও বৈশ্বিক সরবরাহকারীদের অন্যতম প্রধান দেশ।

নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস বা সিইপিআইয়ের বোর্ড ও ইনভেস্টরস কাউন্সিলের উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ভারতের ডিপার্টমেন্ট অব বায়োটেকনোলজি এবং সিইপিআই যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে ভারতের ভ্যাকসিন শিল্পের বর্তমান সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

ড. জিতেন্দ্র সিং বলেন, গত কয়েক বছরে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও সরবরাহে ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এক দশক আগের তুলনায় দেশটির বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জৈবপ্রযুক্তি এবং মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। তাঁর মতে, ভারতের এই সক্ষমতা এখন শুধু দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই; ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মহামারি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও তা কাজে লাগানো সম্ভব।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে ১০০টিরও বেশি দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহ করে। দেশটির সরকারি বক্তব্য অনুসারে, বিশ্বের মোট ভ্যাকসিন উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের ৬৫ শতাংশের বেশি ভারত সরবরাহ করে। এই সক্ষমতা ভারতকে আন্তর্জাতিক টিকাদান ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করেছে।

তবে ভারতের বর্তমান অবস্থানকে শুধু বড় আকারের উৎপাদন দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে না। দেশটির গবেষণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতাও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। একসময় ভারতকে মূলত তুলনামূলক কম খরচে বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য বেশি পরিচিত করা হতো। এখন দেশটির বিজ্ঞান ও শিল্প খাত ভ্যাকসিনের গবেষণা, নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ, উন্নত জৈবিক ওষুধ তৈরি এবং বড় পরিসরে উৎপাদনের পুরো ধারায় সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে ভারতের দ্রুত সম্প্রসারিত বায়ো-অর্থনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের বায়ো-অর্থনীতির আকার ১৯৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে দেশটির বায়োটেক স্টার্টআপের সংখ্যা বেড়ে ১১ হাজার ৮৫৫টিতে দাঁড়িয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে ১ হাজার ৭৮০টি বায়োটেক স্টার্টআপ যুক্ত হয়েছে। বায়োফার্মা খাত ভারতের মোট বায়ো-অর্থনীতির প্রায় ৩০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত।

বায়ো-ফার্মা খাতের মধ্যে ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং বিভিন্ন ধরনের জৈব চিকিৎসাপণ্য অন্তর্ভুক্ত। ফলে বায়োটেকনোলজি খাতের সম্প্রসারণ সরাসরি ভ্যাকসিন গবেষণা ও উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। ভারতের সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ো-অর্থনীতির আকার ৩০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে।

মহামারি মোকাবিলার ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ অভিজ্ঞতা ভারতের সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উঠে এসেছে। মহামারির সময় দ্রুত ভ্যাকসিন উন্নয়ন, উৎপাদন এবং বিভিন্ন দেশে সরবরাহের মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ পায়। ড. জিতেন্দ্র সিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অভিজ্ঞতা ভারতের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ধারণায়ও পরিবর্তন এনেছে।

ভারতের ভ্যাকসিন খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা। সিইপিআইয়ের সঙ্গে ভারতের অংশীদারত্বের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের ভ্যাকসিন, মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। ভারত সিইপিআইয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে এই সহযোগিতা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

এই অংশীদারত্বের আওতায় ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ভ্যাকসিন প্রার্থী নিয়ে কাজ করছে। দেশটির প্রথম এমআরএনএ কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন জেমকোভ্যাক-১৯ জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার একটি ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে এবং মাঙ্কিপক্স ও সারবেকোভাইরাসের মতো রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন উন্নয়নেও কাজ চলছে।

গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অংশীদারত্বটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের বিআরআইসি-টিএইচএসটিআইয়ের বায়োঅ্যাসে ল্যাবরেটরি সিইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গবেষণা ল্যাবরেটরিগুলোর একটি হিসেবে কাজ করছে। এই ধরনের অবকাঠামো বিভিন্ন ভ্যাকসিন প্রার্থীর গবেষণা ও পরীক্ষায় সহায়তা করছে। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবরেটরিটি এখন পর্যন্ত একাধিক ভ্যাকসিন প্রার্থীর উন্নয়নে সহায়তা করেছে এবং বিপুলসংখ্যক নমুনা পরীক্ষা করেছে।

শুধু গবেষণা ও উৎপাদন নয়, দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিইপিআইয়ের সহযোগিতায় পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের গবেষক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের ভ্যাকসিন উন্নয়ন এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে শুধু ভারতের সক্ষমতাই নয়, অংশীদার দেশগুলোর মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতিও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভারতের জন্য এর গুরুত্ব আরও বাড়ে দেশটির রোগের বৈচিত্র্যের কারণে। দেশটিতে বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগের পাশাপাশি অসংক্রামক ও বিপাকীয় রোগেরও বড় চাপ রয়েছে। ফলে রোগজীবাণু, রোগের ধরন এবং মানুষের শরীরে রোগের বিস্তার নিয়ে গবেষণার জন্য দেশটির বাস্তব অভিজ্ঞতা বিজ্ঞানীদের একটি বিস্তৃত গবেষণাক্ষেত্র দিতে পারে বলে মনে করেন ড. জিতেন্দ্র সিং।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভবিষ্যতে নতুন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে দ্রুত ভ্যাকসিন তৈরি ও উৎপাদনের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একটি দেশের গবেষণাগারে নতুন ভ্যাকসিনের প্রাথমিক ধারণা তৈরি হওয়ার পর সেটিকে পরীক্ষাগার পর্যায় থেকে মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে নেওয়া, অনুমোদন পাওয়া এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করা—পুরো প্রক্রিয়ায় সময়, অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়। ভারতের সাম্প্রতিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন সেই সক্ষমতাকে বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।

তবে বৈশ্বিক ভ্যাকসিন সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকা শুধু সরকারি উদ্যোগের ফল নয়। দেশটির বড় ওষুধ ও ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় নির্মাতারা জাতিসংঘের শিশু তহবিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন সরবরাহে বড় ভূমিকা রাখে। ডিপিটি, বিসিজি ও হামসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিনের বৈশ্বিক চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পূরণ করে।

এ অবস্থায় ভারতের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো এই উৎপাদন সক্ষমতাকে কীভাবে আরও বেশি গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। সস্তা ভ্যাকসিনের বড় উৎপাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি উন্নত ভ্যাকসিন প্রযুক্তি, জটিল জৈবিক পণ্য এবং নতুন রোগের বিরুদ্ধে দ্রুত সমাধান তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো দেশটির পরবর্তী লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে।

ড. জিতেন্দ্র সিং সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় কোনো একটি দেশ একা কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারবে না। গবেষণা, তথ্য, প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

সব মিলিয়ে ভ্যাকসিন উৎপাদনে ভারতের উত্থান এখন দেশটির স্বাস্থ্য ও ওষুধশিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার আলোচনাতেও জায়গা করে নিয়েছে। বড় উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি বায়োটেক গবেষণা, স্টার্টআপ, উন্নত ভ্যাকসিন প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলায় ভারতের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে সেই সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে বিশ্বজুড়ে দ্রুত, নিরাপদ ও ন্যায্য ভ্যাকসিন সরবরাহে রূপান্তরিত হবে, সেটিই আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত