প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা থেকে দেশের প্রেক্ষাগৃহ—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দর্শকদের সামনে আসছে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনার আলোচিত চলচ্চিত্র ‘মায়ার জঞ্জাল’। নির্মাণের কয়েক বছর পর নতুন করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাচ্ছে ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী পরিচালিত সিনেমাটি। এতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের অভিনেত্রী অপি করিম ও কলকাতার অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে সিনেমাটি দেখা যাবে। এর মধ্য দিয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর আরও বড় পরিসরের দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে চলচ্চিত্রটির। সিনেমাটি নিয়ে আগে থেকেই দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়া এবং একাধিক পুরস্কার অর্জনের কারণে মুক্তির আগেই ‘মায়ার জঞ্জাল’ আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিল।
‘মায়ার জঞ্জাল’ নির্মিত হয়েছে কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি ছোটগল্প ‘বিষাক্ত প্রেম’ ও ‘সুবালা’ অবলম্বনে। সাহিত্যনির্ভর গল্পকে সমকালীন জীবনের নানা সংকট ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের সঙ্গে মিলিয়ে সিনেমাটির কাহিনি নির্মাণ করেছেন পরিচালক ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী। চিত্রনাট্য নির্মাণেও যুক্ত ছিলেন পরিচালক ও সুগত সিনহা।
সিনেমার গল্পে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, সম্পর্কের জটিলতা, ভালোবাসা, প্রত্যাশা এবং টিকে থাকার সংগ্রাম। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের নানা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া এবং পারিবারিক সংকটকে সামনে আনা হয়েছে। ফলে এটি কেবল একটি সম্পর্কের গল্প নয়, বরং সমাজের নানা স্তরে বসবাস করা মানুষের জীবনসংগ্রামেরও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
সিনেমায় অপি করিম অভিনয় করেছেন সোমা চরিত্রে। তাঁর বিপরীতে ঋত্বিক চক্রবর্তী অভিনয় করেছেন চাঁদুর ভূমিকায়। সংসারের আর্থিক সংকট, স্বামীর বেকারত্ব এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে সোমার জীবন এগিয়ে যায়। অন্যদিকে চাঁদুর সঙ্গে তার দাম্পত্য সম্পর্কেও তৈরি হয় নানা টানাপোড়েন। জীবনের বাস্তব প্রয়োজন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের দ্বন্দ্ব গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ওটিটিতে মুক্তির খবর প্রকাশের পর সিনেমাটির অভিনয়শিল্পীদের নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অপি করিমের অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটি নিয়ে নিজের বক্তব্য জানাতে গিয়ে তিনি ছবিতে তাঁর স্ত্রীর চরিত্রে অপি করিমের অভিনয়কে অসাধারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
অপি করিমের জন্যও ‘মায়ার জঞ্জাল’ ছিল অভিনয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ বিরতির পর বড় পর্দায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। তাঁর অভিনীত সোমা চরিত্রটি সিনেমার আবেগ ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চরিত্রটির মধ্য দিয়ে একজন নারীর সংসার, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
ঋত্বিক চক্রবর্তীও সিনেমাটিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। দুই বাংলার দুই অভিনয়শিল্পীর পাশাপাশি এতে অভিনয় করেছেন সোহেল মণ্ডল, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, চান্দ্রেয়ী ঘোষসহ আরও কয়েকজন পরিচিত শিল্পী। তাঁদের সম্মিলিত অভিনয় সিনেমাটির গল্পকে আরও বিস্তৃত করেছে। বিশেষ করে দুই বাংলার শিল্পীদের অংশগ্রহণ যৌথ প্রযোজনার এই চলচ্চিত্রকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগেই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মাধ্যমে ‘মায়ার জঞ্জাল’ দর্শকদের সামনে আসে। ২০২০ সালে চীনের সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ডের অফিসিয়াল সিলেকশনে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাশিয়ার মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও সিনেমাটির ইউরোপীয় প্রিমিয়ার হয়। এরপর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে এটি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও পরিচিতি পায়।
ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত এশিয়াটিকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ‘এনকাউন্টার উইথ এশিয়ান সিনেমা’ বিভাগে ‘মায়ার জঞ্জাল’ সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জুরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের রেইনবো চলচ্চিত্র উৎসবেও সিনেমাটি সেরা চলচ্চিত্রের সম্মাননা পায়। বাংলাদেশের ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান কমপিটিশন বিভাগেও সিনেমাটি সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার অর্জন করে।
আন্তর্জাতিক উৎসবের এই স্বীকৃতিগুলো সিনেমাটির প্রতি দর্শক ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র বিভিন্ন দেশের উৎসবে জায়গা করে নেওয়ায় এর আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়। উৎসবের দর্শকদের কাছে প্রদর্শনের পর এবার ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাধারণ দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর পালা।
বাংলাদেশ ও ভারতে সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২০২৩ সালে। এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ায় সিনেমাটি নিয়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পরও সিনেমাটির আলোচনার বড় একটি অংশ ছিল এর গল্প, অভিনয় এবং নির্মাণশৈলীকে ঘিরে।
সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন বাংলাদেশের জসিম উদ্দিন। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ভিউজ অ্যান্ড ভিশনস এবং কলকাতার ফ্লিপবুক যৌথভাবে প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। দুই দেশের শিল্পী ও নির্মাতাদের অংশগ্রহণের কারণে সিনেমাটি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারায়ও উল্লেখযোগ্য একটি কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
‘মায়ার জঞ্জাল’-এর বিশেষত্বের আরেকটি জায়গা হলো এর সাহিত্যভিত্তিক নির্মাণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে মানুষের অন্তর্গত সংকট, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সম্পর্কের জটিলতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই সাহিত্যিক আবহকে চলচ্চিত্রের ভাষায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে সিনেমাটিতে। ফলে গল্পের চরিত্রগুলো শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তাদের জীবনযাপন বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
ওটিটিতে মুক্তির ফলে সিনেমাটির সামনে নতুন দর্শকগোষ্ঠী তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যারা প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি দেখার সুযোগ পাননি, তারা এবার ঘরে বসেই এটি দেখার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবং প্রেক্ষাগৃহের পর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সিনেমাটির যাত্রা আরও দীর্ঘ হবে।
২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ‘মায়ার জঞ্জাল’ ওটিটিতে মুক্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে অপি করিম ও ঋত্বিক চক্রবর্তীর অভিনীত এই চলচ্চিত্র আবারও দর্শকদের আলোচনায় ফিরছে। দীর্ঘ সময় ধরে উৎসব ও প্রেক্ষাগৃহের পথ পেরিয়ে এবার ঘরে ঘরে পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকা সিনেমাটি নতুন দর্শকদের কাছে কেমন সাড়া পায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সাহিত্যনির্ভর গল্প এবং দুই বাংলার শিল্পীদের অভিনয়ের কারণে ‘মায়ার জঞ্জাল’ যে ইতোমধ্যেই নিজের একটি আলাদা জায়গা তৈরি করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।