ডেঙ্গুতে এক দিনে ১৮৭২ রোগী হাসপাতালে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
ডেঙ্গুতে এক দিনে ১৮৭২ রোগী হাসপাতালে

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৭২ জন। চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর হিসাবে এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যা। ফলে বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৫ হাজার ৪৯৯ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯৫ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২২ সেপ্টেম্বরের ডেঙ্গুবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৪৭৭ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬০ হাজার ৫৬০ জন।

নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির এই ঊর্ধ্বগতি সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির চিত্র তুলে ধরছে। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনেই ডেঙ্গুতে ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি মাসেই এখন পর্যন্ত এ বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বছরের শুরুর দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুইজন করে এবং মে মাসে একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়।

এক দিনে নতুন রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে এবার যে সংখ্যা সামনে এসেছে, তা আগের কয়েক দিনের তুলনায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তারও আগে ১৫ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৫৯৩ জন এবং ৮ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৫৭১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ধারাবাহিকভাবে উচ্চসংখ্যক রোগী হাসপাতালে আসার ফলে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের ওপর চিকিৎসা চাপও বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ৩৯১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খুলনা বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ৩১৬ জন এবং চট্টগ্রামে ২৮৫ জন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৯১ জন, বরিশালে ১৯০ জন, রাজশাহীতে ১৬২ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৫৯ জন, ময়মনসিংহে ১০৫ জন এবং রংপুরে ৬৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সিলেট বিভাগে নতুন ভর্তি হয়েছেন ছয়জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ডেঙ্গুর বিস্তার এখন শুধু রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন বিভাগে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়েও নজরদারি ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

চলতি বছরের সামগ্রিক পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝাচ্ছে। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৫ হাজার ৪৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬০ হাজার ৫৬০ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৫-এ পৌঁছানোয় মোট প্রাণহানিও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৭৩ এবং নারী ৬৯৯ জন। অর্থাৎ নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় বেশি। একই সময়ে মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও দুজন নারী ছিলেন। মৃতদের বয়স ছিল ১৬ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।

ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর বয়স ও অবস্থার ভিন্নতার কারণে হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসকদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হচ্ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অনেকেই জ্বর, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, মাথাব্যথা কিংবা অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। আবার কারও ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই অবনতির পেছনে এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। জমে থাকা পানি, অপরিষ্কার ও পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ, ছাদ ও বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই শুধু নগর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশার জরিপ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার চিহ্নিতকরণ, দক্ষ কীটতত্ত্ববিদের সম্পৃক্ততা, কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই এবং আধুনিক গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে রোগী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সহায়তাও জরুরি। ডেঙ্গু মৌসুমি রোগ হলেও বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়েই এর প্রকোপ সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন ধারণার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

চলতি বছরের তথ্যের দিকে তাকালে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মাসের ২২ দিনেই ৯৮ জনের মৃত্যু এবং এক দিনে ১ হাজার ৮৭২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর আগে আগস্টেও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল। ফলে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধন এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার করা ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা এখন ২০০-এর কাছাকাছি। একই সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এক দিনে ১ হাজার ৮৭২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার নতুন রেকর্ড পরিস্থিতির তীব্রতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে। সামনে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ে কি না, তা নির্ভর করবে আবহাওয়া, মশার প্রজনন পরিস্থিতি, রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতার ওপর। এই পরিস্থিতিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত