যুদ্ধের প্রস্তুতি, কূটনীতির দরজাও খোলা রাখল ইরান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
যুদ্ধের প্রস্তুতি, কূটনীতির দরজাও খোলা রাখল ইরান

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার সামরিক সংঘাত শুরু হলে ইরান তার মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলেও কূটনীতির পথ বন্ধ করতে চায় না তেহরান। ফলে একদিকে সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতির বার্তা, অন্যদিকে আলোচনার সম্ভাবনা খোলা রাখার অবস্থান—দুই ধরনের বার্তাই একসঙ্গে সামনে এনেছে ইরান।

রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরান দৃঢ়ভাবে তা মোকাবিলা করবে। এমনকি সংঘাত অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছালেও তার জন্য তেহরান প্রস্তুত থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে একই সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেন, যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনীতির সুযোগও ইরান ধরে রাখতে চায়।

আরাগচির বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য চলছে। তেহরান একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এবং পরমাণু ইস্যুতে আলোচনা পুনরায় শুরুর আগ্রহ জানিয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তেহরান যুদ্ধের জন্য যেমন প্রস্তুত, তেমনি আলোচনার জন্যও প্রস্তুত। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ওপর বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজেদের নীতিনির্ধারণের প্রধান বিষয় হিসেবে দেখছে না। তেহরানের কাছে জাতীয় স্বার্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে দুই দেশের অবস্থানও বর্তমান উত্তেজনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠেছে। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধ এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব শর্তের মধ্যে ইরানের আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা, দেশটির ওপর থাকা কিছু অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের অবসান এবং তেল বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের ভূমিকা রয়েছে। ফলে প্রণালিটি ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, জাহাজ চলাচল এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে ওয়াশিংটন তেহরানের প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য মনে করছে না। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, ইরানের প্রস্তাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয় রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ওয়াল্টজের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার ঠেকানোর বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে।

মার্কিন পক্ষের বক্তব্য হলো, আলোচনার আগে ইরান যেসব শর্ত দিয়েছে, সেগুলো ওয়াশিংটনের কাছে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রশ্ন তৈরি করছে। ওয়াল্টজ আরও অভিযোগ করেছেন, আগের সমঝোতার পরও ইরানের কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইরানের নিজস্ব ব্যাখ্যা ভিন্ন। তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের জাতীয় অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে বিবেচনায় নিয়েই যেকোনো আলোচনায় বসতে হবে।

আরাগচি অবশ্য জানিয়েছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তেহরানের আগ্রহ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শান্তির জন্য কোনো সুযোগ থাকলে সেটি নষ্ট করতে চায় না ইরান। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতার সুযোগ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

এর আগে ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রস্তাবটির মূল কাঠামো ছিল যুদ্ধ বন্ধের দিকে অগ্রসর হওয়া, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পরমাণু ইস্যুতে আলোচনা শুরু করা। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে একই সময়ে মার্কিন ও ইরানি পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এমন তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত থাকার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে প্রকাশ্য বক্তব্যে কঠোর অবস্থান থাকলেও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামরিক সংঘাতের ভবিষ্যৎ। আরাগচির বক্তব্যে যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা থাকলেও তিনি নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার ঘোষণা দেননি। বরং তাঁর বক্তব্যের মূল কাঠামো ছিল, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান প্রতিরোধ করবে এবং একই সময়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ থাকলে আলোচনা চালিয়ে যাবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও সামরিক বিকল্প পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় সব বিকল্প বিবেচনায় রাখা হবে। তবে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে কূটনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাগত মূল্যায়নের ওপর।

চলমান উত্তেজনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা রয়েছে। তবে এমন কোনো সম্ভাব্য পদক্ষেপ এখনো নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা হয়নি। আরাগচি বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ক্যালেন্ডারকে নিজেদের সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে দেখছে না।

এরই মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দুই দেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ বন্ধ এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। দুই পক্ষের বক্তব্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হলেও আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা। সামরিক উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে এবং প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব তেল ও জ্বালানির দামের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের পক্ষ থেকে একদিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির ঘোষণা এবং অন্যদিকে কূটনীতির দরজা খোলা রাখার বার্তা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও প্রকাশ্যে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও পরোক্ষ আলোচনার সম্ভাবনা একেবারে বন্ধ করেনি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামরিক পদক্ষেপ এবং মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর। আপাতত তেহরানের অবস্থান হলো—নতুন হামলা হলে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি থাকবে, কিন্তু যুদ্ধের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগও খোলা থাকবে। আর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার ইঙ্গিত রয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত