প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট, গণপরিবহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে নতুন একটি পরিবহনব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় দুটি মনোরেল রুট নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত রুটগুলোর প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন চলছে বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ। তবে কোন দুটি রুট চূড়ান্তভাবে নির্মাণের জন্য বেছে নেওয়া হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত মনোরেল ব্যবস্থা রাজধানীর গণপরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও দক্ষ পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে মনোরেল চালু করা গেলে যাত্রীদের চলাচল আরও সহজ হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় যাত্রীর চাপ বেশি, অথচ প্রচলিত গণপরিবহনের সুবিধা পর্যাপ্ত নয়, সেসব এলাকায় নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
পরিকল্পনাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যমান ও ভবিষ্যতে নির্মিতব্য মেট্রোরেল এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে মনোরেলের সংযোগ স্থাপন। বর্তমানে ঢাকার অনেক যাত্রী মেট্রোরেলে করে নির্দিষ্ট স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছালেও সেখান থেকে চূড়ান্ত গন্তব্যে যেতে বাস, রিকশা কিংবা অন্যান্য যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই শেষ অংশের যাতায়াত বা ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’ সহজ করা নগর পরিবহন পরিকল্পনার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মনোরেলকে মেট্রোরেলের পরিপূরক ও ফিডার পরিবহন হিসেবে গড়ে তোলা গেলে যাত্রীদের এই ভোগান্তি কমতে পারে।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ডিটিসিএ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) সঙ্গে পরামর্শক চুক্তি করেছে। চুক্তির আওতায় রাজধানীর গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে মনোরেল রুটের সমন্বয় এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ পরিচালিত হচ্ছে। বুয়েটের পরামর্শকেরা ইতোমধ্যে প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। এখন বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে নকশা জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং প্রস্তাবিত দুটি মনোরেল রুটের বিস্তারিত নকশা তৈরির জন্য সরকার রাজস্ব বাজেট থেকে ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থের আওতায় সম্ভাব্য রুট, স্টেশন ও ডিপোর অবস্থান, যাত্রী চলাচলের চাহিদা, নির্মাণের কারিগরি উপযোগিতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
হালনাগাদ সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) ঢাকার জন্য প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি মনোরেল রুটের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি হয়ে বসুন্ধরা পর্যন্ত ২৫ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রুটের কথা বলা হয়েছে। মধ্য বাড্ডা থেকে ভুলতা পর্যন্ত প্রস্তাবিত রুটের দৈর্ঘ্য ১৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার। রামপুরা থেকে ডেমরা পর্যন্ত ১০ দশমিক ৩ কিলোমিটার এবং মোহাম্মদপুর থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার রুটও পরিকল্পনায় রয়েছে। এ ছাড়া উত্তরা সেন্টার হয়ে বিমানবন্দর থেকে সাভার পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি রুট প্রস্তাব করা হয়েছে।
এসব রুটের মধ্যে কোনগুলো বাস্তবায়নের জন্য বেশি উপযোগী, তা নির্ধারণে যাত্রীসংখ্যা, সম্ভাব্য সুবিধা, নির্মাণব্যয়, আর্থিক সক্ষমতা এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রুট তিন মাসের মধ্যে চিহ্নিত করার লক্ষ্য রয়েছে। পুরো সমীক্ষা ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত রুট নির্বাচন এবং পরবর্তী নির্মাণকাজের অগ্রগতি নির্ভর করবে সমীক্ষার ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ওপর।
প্রস্তাবিত পাঁচটি রুটের বাইরে আরও কয়েকটি সম্ভাব্য সংযোগপথ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত নয়টি স্টেশনসহ মনোরেল-৮, আলুব্দী থেকে পশ্চিম আগারগাঁও অথবা শ্যামলী পর্যন্ত ১০টি স্টেশনসহ মনোরেল-১০ এবং পল্টন থেকে সদরঘাট অথবা ঝিলমিল পর্যন্ত ছয় কিংবা ১১টি স্টেশনসহ মনোরেল-১৩-এর প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য। এসব সম্ভাব্য পথের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। তবে এগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা ও অগ্রাধিকারও বিস্তারিত মূল্যায়নের বিষয়।
রুট নির্বাচনের ক্ষেত্রে ডিটিসিএ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলের মডেলভিত্তিক সমীক্ষা চালিয়ে যাত্রী চাহিদা নিরূপণ করেছে। এসব তথ্য পরবর্তী বিশ্লেষণের জন্য বুয়েটের পরামর্শকদের দেওয়া হয়েছে। সমীক্ষায় বিভিন্ন এলাকার জনসংখ্যা, সম্ভাব্য স্টেশনগুলোর যাত্রী আকর্ষণের পরিধি, গণপরিবহন সেবার অপ্রাপ্যতা, যানজটের মাত্রা, ডিপো নির্মাণের জন্য জমির প্রাপ্যতা এবং ভবিষ্যতে রুট সম্প্রসারণের সুযোগ বিবেচনা করা হচ্ছে।
মনোরেল সাধারণত উড়াল কাঠামোর ওপর দিয়ে চলাচল করে। ফলে সড়কের জায়গা সীমিত এমন এলাকায় এটি গণপরিবহনের বিকল্প বা পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে নতুন সড়ক নির্মাণ কিংবা বড় অবকাঠামো স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া কঠিন। অনেক এলাকায় বিদ্যমান সড়ক, ভবন, বাজার ও অন্যান্য স্থাপনার কারণে বড় ধরনের পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণও জটিল হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতায় তুলনামূলক সীমিত জায়গা ব্যবহার করে উড়ালপথে যাত্রী পরিবহনের সম্ভাবনা যাচাই করছে কর্তৃপক্ষ।
তবে শুধু উড়ালপথে চলাচলের সুবিধা থাকলেই কোনো পরিবহন প্রকল্প সফল হবে, এমন নয়। মনোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে কত ব্যয় হবে, কতজন যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই থাকবে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। একই সঙ্গে স্টেশন নির্মাণের জন্য জমি, বিদ্যমান সড়ক ও অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়, নিরাপত্তা, যাত্রী ওঠানামার সুবিধা এবং পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষায় তাই শুধু নির্মাণের সম্ভাবনা নয়, প্রকল্পটির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় নগর বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে উপযোগী পরিবহন পরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঢাকার সাধারণ মানুষের কাছে গণপরিবহন কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি কর্মঘণ্টা, পারিবারিক সময়, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দীর্ঘ যানজটে আটকে থেকে প্রতিদিন বিপুল সময় নষ্ট হয়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী কর্মী এবং চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া রোগীদের জন্য এই ভোগান্তি অনেক সময় বাড়তি আর্থিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করে। তাই নতুন পরিবহনব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তার সুফল যেন সাধারণ যাত্রীদের কাছে পৌঁছায়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মনোরেল প্রকল্পের সম্ভাব্য সাফল্য নির্ভর করবে মেট্রোরেল, বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ, যাত্রীবান্ধব স্টেশন, সাশ্রয়ী ভাড়া এবং নির্ভরযোগ্য পরিচালনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর। একই সঙ্গে শুধু নতুন রেলপথ নির্মাণ নয়, স্টেশনকেন্দ্রিক যাতায়াত, পথচারীদের চলাচল এবং শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন। এসব বিষয় উপেক্ষিত হলে নতুন অবকাঠামো তৈরি হলেও প্রত্যাশিত সুফল সীমিত থেকে যেতে পারে।
রাজধানীর যানজট কমানো এবং নগর পরিবহনব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে মনোরেল চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গেও এ উদ্যোগের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি রুট নির্মাণের লক্ষ্য অর্জনে সমীক্ষা, নকশা, অর্থায়ন, অনুমোদন এবং নির্মাণের প্রতিটি ধাপে সময়মতো অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক সমীক্ষা শেষ হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কিন্তু বাস্তব নির্মাণের আগে আরও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ঢাকায় দুটি মনোরেল রুট নির্মাণের পরিকল্পনা নগর পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে কোন রুটে আগে কাজ শুরু হবে, প্রকল্পের মোট ব্যয় কত দাঁড়াবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ শেষ করা সম্ভব হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিস্তারিত নকশা ও মূল্যায়নের ফলাফলের পরই প্রকল্পের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। রাজধানীর কোটি মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে পরিকল্পনাটি যেন বাস্তবসম্মত, অর্থনৈতিকভাবে টেকসই এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত