ঝিনাইগাতীতে মসজিদে হামলার অভিযোগে বিএনপি নেতা নিহত

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
ঝিনাইগাতীতে মসজিদে হামলার অভিযোগে বিএনপি নেতা নিহত

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় মসজিদের ভেতরে হামলার ঘটনায় আবু সালেহ আহমেদ (৬০) নামে এক বিএনপি নেতা নিহত হয়েছেন। শুক্রবার জুমার নামাজের আগে নলকুড়া ইউনিয়নের ভারুয়া বাজার জামে মসজিদে নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে আবু সালেহ আহমেদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় একই গ্রামের আব্দুল মতিনকে প্রধান আসামি করে আরও ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নিহত আবু সালেহ আহমেদ ভারুয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি নলকুড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ভারুয়া বাজার জামে মসজিদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তি ও মসজিদ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই ব্যক্তির মৃত্যুতে এলাকায় শোকের পাশাপাশি উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২০ দিন আগে ভারুয়া বাজার জামে মসজিদের নতুন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে আবু সালেহ আহমেদকে সভাপতি করা হয়েছিল। এর আগে মসজিদটির সভাপতি ছিলেন আব্দুল মতিন। তিনি একটি মামলায় কারাগারে ছিলেন। সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নতুন কমিটিকে অবৈধ বলে দাবি করেন তিনি। এ নিয়ে মসজিদ পরিচালনা ও কমিটির বৈধতা প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কমিটি গঠনের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও উত্তেজনা চলছিল। মসজিদের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও তা সমাধানের জন্য আলোচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই বিরোধ শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী ঘটনায় রূপ নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

শুক্রবার জুমার নামাজের আগে মসজিদে কমিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ওই সময় আব্দুল মতিন ও তাঁর পক্ষের কয়েকজন বক্তব্য দিতে চান বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাঁদের নামাজের পর বিষয়টি নিয়ে কথা বলার অনুরোধ করেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তেজনার মধ্যেই আব্দুল মতিন ও তাঁর সহযোগীরা আবু সালেহ আহমেদের ওপর হামলা চালান। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে উপস্থিত লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে হামলার ধরন, আঘাতের প্রকৃতি এবং মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নলকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রোকনুজ্জামান রঞ্জু ঘটনার বিষয়ে বলেন, জুমার নামাজের আগে মসজিদে আলোচনা চলছিল। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এর মধ্যেই আবু সালেহ আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্যে ঘটনার সময় মসজিদে উত্তেজনার বিষয়টি উঠে এলেও মৃত্যুর কারণ ও দায় নির্ধারণে চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং পুলিশের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এদিকে ঘটনার পর নিহতের ছেলে জাকির হোসেন উজ্জ্বল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঝিনাইগাতী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় আব্দুল মতিনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আরও ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেবে। তবে এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো তদন্তের বিষয়। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না।

অন্যদিকে আব্দুল মতিনের ভাই ময়নাসহ অভিযুক্ত কয়েকজন তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে ঘটনার সময় কে কী ভূমিকা পালন করেছেন, হামলার অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দুই পক্ষের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করেই ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব।

ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম নূর মোহাম্মদ জানিয়েছেন, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। একই সঙ্গে মামলার তদন্তে ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি, হামলার অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা হবে।

একটি মসজিদ সাধারণত ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার জায়গা। সেখানে কমিটি গঠন বা পরিচালনা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু সেই বিরোধ যদি সংঘর্ষে গড়ায়, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষ নয়, পুরো এলাকার মানুষের মধ্যেই অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উপাসনালয়ের ভেতরে এমন প্রাণহানির অভিযোগ স্থানীয় সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির দায়িত্ব, বৈধতা কিংবা নেতৃত্ব নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা নির্ধারিত নিয়ম ও স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় সমাধান করা প্রয়োজন। কোনো বিরোধের নিষ্পত্তি জোর প্রয়োগ বা সহিংসতার মাধ্যমে হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের দায়িত্বশীল মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। উত্তেজনা তৈরি হলে দ্রুত মধ্যস্থতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ প্রয়োজন।

আবু সালেহ আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবার একজন স্বজনকে হারিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও ঘটনাটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একজন মানুষের মৃত্যু এবং তার পেছনের প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন। নিহতের পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়, আবার তদন্ত যেন কোনো পক্ষের প্রভাব বা চাপের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়—এটি নিশ্চিত করা জরুরি।

এখন পুলিশের তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের দিকে নজর থাকবে। মামলায় যাঁদের আসামি করা হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং এলাকায় আর কোনো সংঘাত যেন না ছড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মসজিদকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিরোধের পরিণতিতে একজন মানুষের প্রাণহানির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারই এখন নিহতের পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com