খুলনায় আটক সুন্দরবনের জোনাব বাহিনীর প্রধান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
খুলনায় আটক সুন্দরবনের জোনাব বাহিনীর প্রধান

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানার কৈয়া বাজার এলাকা থেকে সুন্দরবনের বনদস্যু চক্র হিসেবে পরিচিত ‘জোনাব বাহিনীর’ প্রধান জোনাব আলীকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাত ১১টার দিকে এসআরবি-৬-এর স্পেশাল কোম্পানির একটি আভিযানিক দল বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানের পর তাঁকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আটক জোনাব আলী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর গ্রামের মৃত কেরামত আলীর ছেলে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক ‘জোনাব বাহিনী’র প্রধান হিসেবে তাঁর পরিচিতির কথা জানানো হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কী কী নির্দিষ্ট মামলা রয়েছে, কোন কোন ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে জারি হওয়া কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আটকের পর তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট থানার নথি ও তদন্তের ভিত্তিতেই স্পষ্ট হবে।

এসআরবি-৬ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কৈয়া বাজার এলাকায় জোনাব আলীর অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারে আভিযানিক দল। পরে পরিকল্পিতভাবে সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে তাঁকে আটক করতে সক্ষম হন সদস্যরা। আটকের পর প্রয়োজনীয় প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করা হয়। এখন তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ, মামলার নথি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অন্যান্য আইনগত বিষয় যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে পুলিশের।

সংশ্লিষ্ট বাহিনী জানিয়েছে, নিয়মিত মামলার আসামি, বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত ব্যক্তি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি এবং চাঞ্চল্যকর হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তবে জোনাব আলীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও মামলার বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলে তাঁর অপরাধের ধরন বা সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই বন থেকে মাছ, কাঁকড়া, মধু, গোলপাতা ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন বহু জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালি। জীবিকার প্রয়োজনে তাঁদের অনেককে নদী, খাল ও বনের গভীর এলাকায় যেতে হয়। এসব স্থানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে জনবসতি ও নিরাপদ আশ্রয় থেকে দূরে কাজ করতে হয়। ফলে বনাঞ্চলে অপরাধী চক্রের তৎপরতা থাকলে তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে জেলেদের নৌযান ও মাছ ধরার কার্যক্রমে বাধা দেওয়া, অপহরণ, জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি এবং অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। এসব অপরাধের আশঙ্কা থাকলে বনজ সম্পদ আহরণে নিয়োজিত মানুষের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। অনেক পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। কোনো জেলে বা বনজীবী বনে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে ফিরে না এলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। আবার মুক্তিপণের দাবির মতো অভিযোগ সত্য হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সংকটের মুখেও পড়তে হয়। তাই সুন্দরবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

চলতি বছরের জুন মাসেও সুন্দরবনের জোনাব বাহিনীর তিন সদস্যকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটকের খবর পাওয়া গিয়েছিল। ওই অভিযানে আটক ব্যক্তিরা ছিলেন আজিবার গাজী, রবিউল গাজী ও ফারুক হোসেন। সে সময় কোস্ট গার্ডের অভিযানে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শ্যামনগরের হরিণটানা খালসংলগ্ন এলাকা থেকে একটি একনলা বন্দুক ও দুই রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধারের কথাও জানানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বাহিনীর দাবি ছিল, আটক ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে ডাকাতি এবং জেলে ও বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে জুনের ওই অভিযানের সঙ্গে ৬ নভেম্বর আটক জোনাব আলীর ঘটনার সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নতুন করে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বনজীবীদের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। বনের বিভিন্ন নদী ও খালে যাতায়াতকারী জেলে এবং বনজ সম্পদ আহরণকারীরা অনেক সময় অপরাধী চক্রের গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের পরিচয় ও তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালিত হলে আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি।

জোনাব আলীকে আটকের ঘটনায় সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধ দমনের কার্যক্রমে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বনাঞ্চলে যাঁরা প্রতিদিন জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও এর পাশাপাশি অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের অভিযোগ গ্রহণ, অপহরণ বা মুক্তিপণের ঘটনার তদন্ত এবং অপরাধী চক্রের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস শনাক্ত করা প্রয়োজন। শুধু একজনকে আটক করলেই কোনো অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ দমনের কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।

এদিকে আটক জোনাব আলীর বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হরিণটানা থানায় হস্তান্তরের পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার নথি, অভিযোগ ও আইনগত অবস্থান যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতেই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। সুন্দরবনকে নিরাপদ রাখা, বনজীবীদের নির্বিঘ্নে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিযান কতটা কার্যকর হয়, তা পরবর্তী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com