পলাতক শক্তির ষড়যন্ত্র নিয়ে রিজভীর উদ্বেগ প্রকাশ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
পলাতক শক্তির ষড়যন্ত্র নিয়ে রিজভীর উদ্বেগ প্রকাশ

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পলাতক শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘাতকরা ষড়যন্ত্র করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। তিনি অভিযোগ করেছেন, দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য একটি মহল নানা ধরনের অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব মন্তব্য করেন রিজভী। এ সময় তিনি ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তৎকালীন ক্ষমতাকাঠামো, নাগরিক অধিকার সংকোচন এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজের রাজনৈতিক মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়।

রিজভী বলেন, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী অল্প সময়ের মধ্যে গোটা জাতিকে একটি নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, আইন প্রণয়ন ও বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত হয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও গভীর হয়ে ওঠে।

তিনি ওই সময়ের ঘটনাবলিকে দেশের ইতিহাসের একটি সংকটময় অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি সংঘাত এবং রক্তপাতের কারণে রাষ্ট্র ও সমাজে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ তখন নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রিজভীর বক্তব্যে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, ওই সময় দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়া। তাঁর দাবি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশ সেই প্রত্যাশার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।

রিজভী আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তাঁর পরিবারকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পরিস্থিতিতে একটি স্বাধীন দেশের মানুষের স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষা গভীর হতাশার মধ্যে পড়ে যায়। দেশের সর্বত্র অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা বিরাজ করছিল। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন কামনা করছিল।

তিনি বলেন, সেই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান মুক্তি লাভ করেন। তাঁর মুক্তির মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ নতুন করে রাজনৈতিক পথের দিশা খুঁজে পেয়েছিল বলে মনে করেন রিজভী। তাঁর মতে, ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলের মূল্যায়ন করতে গিয়ে রিজভী বলেন, তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে অগ্রসর হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন বিএনপির এই নেতা।

রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালুর ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিল। তাঁর মতে, একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যেও এসব ঐতিহাসিক বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। দিবসটি দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা স্মরণ করার পাশাপাশি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। প্রতিবছর এ উপলক্ষে দলের নেতাকর্মীরা তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এবারও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে দিবসটি ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

তবে ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলি বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুমাত্রিক ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়। সে সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল প্রতিষ্ঠা ছিল ওই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর দেশে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা তৈরি হয়।

বিশেষ করে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এ সময় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বিএনপি সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও জাতীয় সংহতির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। দলটির নেতাদের মতে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পথ তৈরি হয় এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। তবে ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ও গবেষকের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য যুক্ত করেও বক্তব্য দিয়েছেন রিজভী। তাঁর অভিযোগ, দেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য পলাতক শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ষড়যন্ত্র করছে। যদিও এ বক্তব্যের পক্ষে তিনি বিস্তারিত কোনো ঘটনা, ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট পরিকল্পনার তথ্য প্রকাশ করেননি, তবু তাঁর মন্তব্যে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিএনপির উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একটি দেশে স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক বিরোধ ও মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হলেও সহিংসতা, ষড়যন্ত্র কিংবা অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো জনগণের মধ্যে বিভাজন না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখা।

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন অনেকাংশে স্থিতিশীল পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পড়ে উদ্যোক্তা, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ পরিবারের ওপর। ফলে জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গেও জড়িত।

রিজভীর বক্তব্যে তাই একদিকে যেমন ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতি বিএনপির নিজস্ব মূল্যায়ন উঠে এসেছে, অন্যদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অগ্রগতি ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার আহ্বানও প্রতিফলিত হয়েছে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য, গণতন্ত্র এবং জাতীয় সংহতি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com