প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি ব্যালন ডি’অর জিতলেন উসমান দেম্বেলে। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল প্রশ্নটি—বার্সেলোনার তরুণ প্রতিভা লামিন ইয়ামাল নাকি পিএসজির অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড দেম্বেলে? শেষ পর্যন্ত সোমবার রাতে প্যারিসের ঐতিহাসিক থিয়াত্র দু শাতেলেতে অনুষ্ঠিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ফরাসি তারকা দেম্বেলের হাতেই উঠল স্বপ্নের এই সোনালি বল।
২৮ বছর বয়সী দেম্বেলের এই অর্জন নিছক কাকতালীয় নয়। গেল মৌসুমে লুইস এনরিকের কোচিংয়ে তার নেতৃত্বেই পিএসজি জিতেছে অভাবনীয় চারটি শিরোপা। লিগ ওয়ান, কুপ দ্য ফ্রান্স ও ফ্রেঞ্চ সুপার কাপের সঙ্গে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত শিরোপা চ্যাম্পিয়নস লিগ এনে দিয়েছেন তিনি। এটিই ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়, যা পিএসজির সমর্থকদের জন্য এক স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
পুরো মৌসুমে দেম্বেলের পরিসংখ্যানও বিস্ময়কর। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৫টি গোল এবং ১৬টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের জন্য গোলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন নিয়মিত। তার গতি, ড্রিবলিং এবং সৃজনশীলতা প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের নাম। পিএসজির আক্রমণভাগের প্রাণকেন্দ্রে ছিলেন তিনি, যা শেষ পর্যন্ত তাকে এনে দিয়েছে ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পুরস্কার।
চূড়ান্ত ভোটে দেম্বেলে এবং বার্সেলোনার ইয়ামাল ছিলেন শীর্ষ দুইয়ে। যদিও ১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল পুরো মৌসুমে নজরকাড়া পারফরম্যান্সে ফুটবল দুনিয়ার প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, তবুও অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের দিক থেকে দেম্বেলে এগিয়ে ছিলেন। তৃতীয় স্থানে ছিলেন পিএসজির আরেক তারকা ভিতিনিয়া, চতুর্থ স্থানে লিভারপুলের মিশরীয় ফরোয়ার্ড মোহামেদ সালাহ এবং পঞ্চম স্থানে ছিলেন বার্সেলোনার রাফিনিয়া। শীর্ষ দশে আরও জায়গা করে নিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, আশরাফ হাকিমি, কোল পালমার, জিয়ানলুইজি দোন্নারুমা ও নুনো মেন্দেস।
পুরস্কার হাতে নিয়ে আবেগে ভেসে যান দেম্বেলে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “যা আমি অনুভব করছি, তা অসাধারণ। পিএসজির সঙ্গে গত মৌসুম ছিল অবিশ্বাস্য। আমি একটু নার্ভাস, এটা সহজ নয়। রোনালদিনহোর হাত থেকে এই পুরস্কার নেওয়া আমার জীবনের বিশেষ মুহূর্ত। ধন্যবাদ জানাই পিএসজিকে, যারা ২০২৩ সালে আমাকে দলে নিয়েছিল। ক্লাবের সভাপতি নাসের আল খেলাইফি আমার কাছে বাবার মতো। লুইস এনরিকেও আমার ক্যারিয়ারে বাবার মতো ছিলেন। আমার সতীর্থদেরও ধন্যবাদ, কারণ এই ব্যক্তিগত পুরস্কার আসলে পুরো দলের জয়।”
এই পুরস্কার জয়ের মাধ্যমে দেম্বেলে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ে প্রবেশ করলেন। অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের পর, চোটের কারণে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকা এবং সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার পর অবশেষে তিনি নিজের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। একসময় বার্সেলোনায় তাকে বলা হতো ‘ইনজুরি-প্রবণ’ ফুটবলার, কিন্তু পিএসজিতে এসে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, ব্যালন ডি’অর জিততে না পারলেও ইয়ামাল থেমে নেই। ১৮ বছর বয়সেই টানা দ্বিতীয়বার জিতেছেন অনূর্ধ্ব-২১ সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার কোপা ট্রফি। এই পুরস্কারের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো খেলোয়াড় একে একাধিকবার জিতলেন। ফলে ব্যালন ডি’অর জিততে না পারলেও তিনি প্রমাণ করেছেন, ভবিষ্যতে বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে তার অবস্থান একেবারেই নিশ্চিত। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইয়ামাল কেবল সময়ের অপেক্ষায় আছেন। সঠিক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ব্যালন ডি’অরও একদিন তার হাতে উঠবে।
ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, দেম্বেলের এই জয় কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পিএসজির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের প্রতীক। বহু বছর ধরে বিপুল অর্থ খরচ করেও ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্ব ছুঁতে পারেনি ফরাসি জায়ান্টরা। অবশেষে দেম্বেলে ও তার সতীর্থদের হাত ধরে সেই আক্ষেপ ঘুচেছে। এর প্রভাব ফরাসি ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন অনেকে।
অন্যদিকে, ইয়ামালের অপেক্ষা যেন নতুন প্রজন্মের প্রতীকী রূপক। ফুটবল এক অবিচ্ছিন্ন ধারা, যেখানে পুরোনো তারকারা শীর্ষে পৌঁছান, আবার তরুণরা উঠে আসেন নতুন দিগন্তের সন্ধানে। ইয়ামাল সেই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা ভবিষ্যতে বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করবে।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অসংখ্য ফুটবল কিংবদন্তি, বর্তমান খেলোয়াড় ও কোচরা। রোনালদিনহোর হাত থেকে ব্যালন ডি’অর নেওয়ার মুহূর্তটি দেম্বেলের জন্য যেমন স্বপ্নপূরণ, তেমনি সমর্থকদের জন্যও আবেগঘন দৃশ্য ছিল। কারণ রোনালদিনহো একসময় দেম্বেলের আদর্শ ছিলেন।
২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর বিতর্কহীনভাবে দেম্বেলের হাতে উঠলেও ইয়ামাল, ভিতিনিয়া বা সালাহর মতো খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ইয়ামালের কোপা ট্রফি জয় এবং তার বয়স বিবেচনায় ফুটবল বোদ্ধারা নিশ্চিত, ভবিষ্যতের ব্যালন ডি’অর জয়ের প্রধান দাবিদার তিনিই।
শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর জেতা যেমন ব্যক্তিগত গৌরব, তেমনি এটি ফুটবলের ইতিহাসের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। উসমান দেম্বেলে তার ক্যারিয়ারে এই মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখলেন, আর ফুটবল দুনিয়াকে মনে করিয়ে দিলেন—অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।