“এশিয়া কাপ জয়ে মোদির ‘অপারেশন সিঁদুর’ তুলনা, পাল্টা ক্ষোভ পাকিস্তানের”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
“এশিয়া কাপ জয়ে মোদির ‘অপারেশন সিঁদুর’ তুলনা, পাল্টা ক্ষোভ পাকিস্তানের”

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনালে ভারত ও পাকিস্তানের চিরন্তন লড়াই আবারও কোটি মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় ভরপুর এই ম্যাচে ভারত ৫ উইকেট ও ২ বল হাতে রেখে পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা জয় করে। তবে টুর্নামেন্ট শেষ হলেও মাঠের বাইরের উত্তেজনা যেন আরও বেড়ে উঠেছে রাজনৈতিক মন্তব্যের কারণে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খেলার এই জয়কে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চালানো সামরিক অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেছেন, আর তাতেই নতুন করে শুরু হয়েছে তর্ক-বিতর্ক।

ফাইনাল ম্যাচের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্স অ্যাকাউন্টে একটি বার্তায় লেখেন, “খেলার মাঠেও অপারেশন সিঁদুর। ফলাফল একই—ভারতের জয়! অভিনন্দন আমাদের ক্রিকেটারদের।” তাঁর এই মন্তব্য সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অতীত সামরিক অভিযানের সঙ্গে ক্রীড়া জয়কে এক করে তোলায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি এ মন্তব্যের জবাব দিতে সময় নষ্ট করেননি। তিনি মোদির পোস্ট রিটুইট করে লিখেছেন, “যদি যুদ্ধই তোমার গর্বের মাপকাঠি হয়, তবে ইতিহাস ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের হাতে ভারতের লজ্জাজনক পরাজয়ের কথা লিখে রেখেছে। কোনো ক্রিকেট ম্যাচ সেই সত্যকে বদলাতে পারবে না। খেলায় যুদ্ধ টেনে আনা শুধু হতাশাকে প্রকাশ করে আর খেলার মূল চেতনাকেই কলঙ্কিত করে।”

সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে এসেছে ১৯০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স

এই বক্তব্যগুলোর বিনিময় আবারও প্রমাণ করছে, ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, খেলাধুলার অঙ্গনেও বারবার প্রতিফলিত হয়। দু’দেশের ক্রিকেট দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরেই দুই জনগোষ্ঠীর জাতীয় আবেগকে নাড়া দিয়ে আসছে। কিন্তু এবারের ঘটনাটি এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে, কারণ এতে রাজনৈতিক ইতিহাস ও সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে।

মোদি যে “অপারেশন সিঁদুর” প্রসঙ্গ তুলেছেন, তা মূলত গত মে মাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের চালানো এক সামরিক অভিযানকে ইঙ্গিত করে। এর আগে, এপ্রিলে কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ভারতীয় সেনাদের প্রাণহানি ঘটে। এর প্রতিক্রিয়ায় মে মাসে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ভারতীয় সেনারা অভিযান চালায়, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে কয়েকদিনের জন্য চরম অস্থিতিশীল করে তোলে। পাল্টা হামলা শুরু হলে দুই দেশ চার দিনব্যাপী সীমান্তে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় থামে। উভয় দেশ তখনই নিজেদের জয় দাবি করে প্রচারণা চালাতে থাকে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের ‘অপারেশন সিঁদুর’ পাকিস্তানের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ককে ধ্বংস করেছে। অপরদিকে পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতীয় সেনাদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে পাল্টা ক্ষতি সাধন করেছে। এই বিতর্কিত ‘বিজয়’ বয়ানগুলো রাজনৈতিক বক্তৃতা, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমাগত ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ক্রিকেট মাঠে মোদির সামরিক অভিযানকে তুলনা করার বক্তব্য তাই নতুন কোনো প্রেক্ষাপট নয়, বরং পুরনো সেই বিতর্কের পুনরুজ্জীবন। পাকিস্তান এই বক্তব্যকে অবমাননাকর বলে উল্লেখ করছে এবং বলছে খেলাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। মহসিন নাকভি সরাসরি উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধ আর খেলার জয়–পরাজয়কে এক করে দেখানো মানে ক্রীড়ার চেতনাকে কলুষিত করা। পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলোও বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে এবং বলছে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে ক্রিকেট জয়কে সামরিক অভিযানের প্রোপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করছেন।

অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি ছিল কেবল একটি রূপক উক্তি, যার উদ্দেশ্য ছিল খেলোয়াড়দের প্রশংসা করা। বিজেপি ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদির এই মন্তব্য দেশীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও প্রভাব ফেলবে। আসন্ন রাজ্য নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী আবেগ জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি এ ধরনের মন্তব্যকে ব্যবহার করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের এই দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা প্রমাণ করে যে, দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক কূটনৈতিক আলোচনার জায়গা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে। ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলার মধ্যে সামরিক তুলনা টেনে আনা সেই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে উভয় দেশের নেতাদের আরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিতর্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের সমর্থকরা মোদির বক্তব্যকে দেশপ্রেমিক ও সাহসী বলে আখ্যা দিচ্ছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানি ব্যবহারকারীরা এটিকে উসকানিমূলক ও খেলাধুলার মর্যাদাহানিকর বলছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মনে করছেন, ক্রিকেট মাঠে রাজনৈতিক উত্তাপের প্রতিফলন দুই দেশের সম্পর্কের নাজুক অবস্থারই প্রতিচ্ছবি।

তবে সবকিছু ছাড়িয়ে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো ক্রিকেট ম্যাচ কেবল একটি খেলা হলেও ভারত–পাকিস্তান প্রেক্ষাপটে তা প্রায়শই জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এই ম্যাচগুলো শুধু ব্যাট–বল দিয়ে খেলা হয় না, বরং রাজনৈতিক ইতিহাস, সীমান্ত সংঘাত ও জাতীয়তাবাদী আবেগের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মোদি ও নাকভির সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই সত্যটিকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত