যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বার্সেলোনার লা লিগা ম্যাচ: উয়েফার অনিচ্ছুক অনুমোদন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১০৯ বার

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দীর্ঘদিনের আলোচনা, বিতর্ক এবং আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা যুক্তরাষ্ট্রে একটি লা লিগা ম্যাচ আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে। স্পেনের দুটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব—বার্সেলোনা ও ভিয়ারিয়ালের মধ্যকার ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে। বহু বছরের চেষ্টার পর লা লিগার জন্য এটি এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হলেও, উয়েফা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনিচ্ছাসত্ত্বেও এবং বিশেষ শর্তসাপেক্ষে।

উয়েফার এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সংগঠনটি নিজ দেশের বাইরে ঘরোয়া লিগের ম্যাচ আয়োজনের ব্যাপারে নীতিগতভাবে ‘স্পষ্ট বিরোধী’। তবে ফিফার বর্তমান অস্পষ্ট নিয়মনীতি এবং নতুন আন্তর্জাতিক নির্দেশিকার আলোকে ব্যতিক্রম হিসেবে দুটি ম্যাচের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে— এর একটি লা লিগার বার্সেলোনা বনাম ভিয়ারিয়াল ম্যাচ, অন্যটি ইতালিয়ান সিরি আ’র এসি মিলান ও কোমোর ম্যাচ।

লা লিগার ঐতিহাসিক এই ম্যাচটি আগামী ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত হার্ড রক স্টেডিয়ামে, যা এনএফএল দলের মায়ামি ডলফিনসের হোম ভেন্যু হিসেবেও পরিচিত। অন্যদিকে সিরি আ’র ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে। এখন এই দুই ম্যাচ আয়োজনের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ফিফার সবুজ সংকেত প্রয়োজন, কারণ সংস্থাটিরই শেষ সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে ইউরোপের দলগুলো বিদেশে লিগ ম্যাচ আয়োজন করতে পারবে কি না।

উয়েফা জানিয়েছে, ফিফা এখনো ‘ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ রেগুলেশন’ সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করেনি। তাই তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত এই ম্যাচগুলোর আয়োজন “শর্তাধীন অনুমোদনের” পর্যায়ে থাকবে।

তবে এই সিদ্ধান্তের পরপরই ইউরোপজুড়ে সমর্থক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা দাবি করেছে, নিজ দেশের বাইরে ঘরোয়া লিগের ম্যাচ আয়োজন ফুটবলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্থানীয় দর্শকপ্রেমের পরিপন্থী। ইউরোপিয়ান ফুটবল সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (EFSA) এক বিবৃতিতে জানায়, “লা লিগা বা সিরি আ যেকোনো দলই হোক, তাদের নিজস্ব মাঠে, নিজস্ব দর্শকদের সামনে খেলাই ঘরোয়া লিগের মূল সত্তা। বাণিজ্যিক কারণে তা বিদেশে সরিয়ে নেওয়া ফুটবল সংস্কৃতির প্রতি একপ্রকার অসম্মান।”

অন্যদিকে, লা লিগার পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকেই তারা যুক্তরাষ্ট্রে একটি অফিসিয়াল লিগ ম্যাচ আয়োজনের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে, তবে উয়েফা এবং ফিফার কঠোর বিরোধিতার কারণে এতদিন তা সম্ভব হয়নি। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (RFEF)-এরও শুরুতে এই পরিকল্পনার প্রতি আপত্তি ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা লা লিগার বাণিজ্যিক কৌশলকে সমর্থন জানিয়েছে।

লা লিগার সভাপতি হাভিয়ের তেবাস এই সিদ্ধান্তে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন, “আমরা গত সাত বছর ধরে চেষ্টা করেছি। অবশেষে উয়েফা বুঝেছে— ফুটবলকে বিশ্বায়নের পথে এগিয়ে নিতে হলে নতুন ভাবনা ও নতুন বাজারে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে এই ম্যাচ শুধু লা লিগারই নয়, বরং ইউরোপীয় ফুটবলের জন্যও একটি বড় পদক্ষেপ।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লা লিগার এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক লাভ। যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং মেসি-রোনালদো যুগের পর ইউরোপীয় ফুটবলের দর্শকসংখ্যা ধরে রাখার প্রয়াসে লা লিগা নতুন বাজারে প্রবেশ করতে চাইছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও মেজর লিগ সকার (MLS)-এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক, তাই লা লিগা তাদের দর্শকভিত্তি বাড়াতে এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে বার্সেলোনা ক্লাবটিও এই ম্যাচের মাধ্যমে তাদের ব্র্যান্ডমূল্য পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ দেখছে। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ক্লাবটি বর্তমানে নতুন রাজস্ব উৎস খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ আয়োজন করলে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার অধিকার ও স্পনসরশিপ থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। হার্ড রক স্টেডিয়ামে প্রায় ৬৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা রয়েছে, যা ইতিমধ্যেই লা লিগা ও বার্সেলোনার মধ্যে একটি বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, ইউরোপের অনেক ক্লাবই এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও বুন্দেসলিগা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে। তাদের মতে, এটি ইউরোপীয় ফুটবলের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং দেশীয় দর্শকদের প্রতি অবিচার হবে। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই দুই ম্যাচ সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইউরোপের আরও অনেক লিগ বাণিজ্যিক কারণে বিদেশে ম্যাচ আয়োজনের পথে হাঁটতে পারে।

ফিফার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সংস্থাটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। তবে তারা ইউরোপের বাইরে ঘরোয়া ম্যাচ আয়োজনের নীতিমালা প্রণয়নে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে, যাতে খেলোয়াড়দের বিশ্রাম, ভ্রমণ ও প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

স্প্যানিশ গণমাধ্যমগুলো বলছে, মিয়ামিতে অনুষ্ঠিতব্য এই ম্যাচের সম্প্রচার অধিকার ইতিমধ্যেই কয়েকটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের আগ্রহ কুড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লাতিন আমেরিকান ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে এ নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বার্সেলোনা ও ভিয়ারিয়াল উভয় দলই ইতোমধ্যে প্রাথমিক প্রস্তুতির পরিকল্পনা শুরু করেছে, যদিও খেলোয়াড়দের ক্লান্তি ও দীর্ঘ ভ্রমণ নিয়ে কোচদের মধ্যে কিছুটা সংশয় দেখা গেছে।

সবমিলিয়ে, উয়েফার অনিচ্ছুক সম্মতি ও ফিফার অপেক্ষমাণ অনুমোদনের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ফুটবল নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে বার্সেলোনা–ভিয়ারিয়াল ম্যাচ শুধু একটি ক্রীড়া ইভেন্ট নয়, বরং এটি হতে পারে ফুটবলের বিশ্বায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ ও ঐতিহ্যের সংঘর্ষের এক প্রতীকী অধ্যায়।

এখন বিশ্বজুড়ে নজর থাকবে ২১ ডিসেম্বরের দিকে— যখন বার্সেলোনা মাঠে নামবে স্পেন নয়, বরং আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে, এবং ফুটবল বিশ্ব হয়তো সাক্ষী হবে এক নতুন যুগের সূচনার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com