প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে, আর সেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে আজ বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। পাকিস্তানের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করা লাল-সবুজের মেয়েরা আজ মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের পরাশক্তি ইংল্যান্ডের। ভারতের গোয়াহাটির মাঠে বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হবে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে আত্মপ্রকাশের নতুন সুযোগ।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নারী দলের এই অগ্রযাত্রা অনেকটা নতুন হলেও, তাদের আত্মবিশ্বাস ও পারফরম্যান্স এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৭ উইকেটের জয় এনে দলটি যে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে, সেটিই আজ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াইয়ে তাদের প্রধান প্রেরণা হয়ে উঠেছে। সেই ম্যাচে নিগার সুলতানার নেতৃত্বে দলটি কেবল টেকনিক্যাল দিক থেকেই নয়, মানসিক দৃঢ়তাতেও নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছে।
অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড নারী দল ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অর্জনের দিক থেকে অনেক এগিয়ে। তারা চারবারের বিশ্বকাপজয়ী দল, এবং বর্তমানে আইসিসি নারী ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ যেখানে সপ্তম স্থানে, সেখানে ইংল্যান্ডের আধিপত্য স্পষ্ট। তবে ক্রিকেট এমন একটি খেলা যেখানে অতীতের পরিসংখ্যান কখনোই মাঠের ফলাফল নির্ধারণ করে না।
ইংল্যান্ড তাদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১০ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছে দুর্দান্তভাবে। তাদের পেস আক্রমণ এতটাই ধারালো ছিল যে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০.৪ ওভারেই গুটিয়ে যায় মাত্র ৬৯ রানে। জবাবে ইংলিশরা মাত্র ১৪.১ ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায়। এই উড়ন্ত সূচনা নিঃসন্দেহে তাদের মনোবল আরও দৃঢ় করেছে।
বাংলাদেশ অধিনায়ক নিগার সুলতানা অবশ্য জানেন, আজকের ম্যাচটি সহজ হবে না। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “ইংল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল। কিন্তু আমাদের দলও এখন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় আমাদের নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা জানি এই ম্যাচটি চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার জন্যই মাঠে নামব।”
ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের ওয়ানডে সাক্ষাৎ ইতিহাসে খুব বেশি পুরনো নয়। এ পর্যন্ত দুই দল একবারই মুখোমুখি হয়েছে— ২০২২ সালের বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ড ১০০ রানের বড় ব্যবধানে জয় পায়। প্রথমে ব্যাট করে ইংলিশরা ৬ উইকেটে ২৪৩ রান তোলে। জবাবে ১৩৪ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। তবে তিন বছর আগের সেই ম্যাচের অভিজ্ঞতা এখন অনেকটাই ইতিহাস। নতুন প্রজন্মের লাল-সবুজের যোদ্ধারা আজ নতুনভাবে নিজেদের প্রমাণ করতে মাঠে নামবে।
বাংলাদেশের জন্য আজকের ম্যাচে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাদের দলীয় সমন্বয় ও উদ্যম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড় উঠে এসেছেন, যারা ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে ফারজানা হক, মুরশিদা খাতুন ও রুমানা আহমেদের ব্যাটিং ফর্ম এবং সালমা খাতুন ও নাহিদা আখতারের স্পিন আক্রমণ আজ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইংল্যান্ডের দলে রয়েছেন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের এক শক্তিশালী লাইনআপ— হিদার নাইট, ন্যাট সিভার-ব্রান্ট, সোফি এক্লেস্টোন, ও ড্যানি ওয়াটের মতো তারকারা, যারা যেকোনো সময় ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। বিশেষ করে এক্লেস্টোনের স্পিন বোলিং বাংলাদেশি ব্যাটারদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
বাংলাদেশ দলের কোচ হাশান তিলকারত্নে মনে করেন, এই ম্যাচে জয়ের মূল চাবিকাঠি হবে ধৈর্য ও পরিকল্পিত খেলা। “আমরা জানি ইংল্যান্ড একটি অভিজ্ঞ দল। তবে আমাদের মেয়েরা মানসিকভাবে প্রস্তুত। ওরা শিখছে, উন্নতি করছে, এবং প্রতিটি ম্যাচেই নতুন কিছু করে দেখাতে চায়। আমি বিশ্বাস করি, যদি আমরা প্রথম ১০ ওভার ভালোভাবে পার করতে পারি, ম্যাচটি অনেক দূর টেনে নেওয়া সম্ভব।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ম্যাচে বাংলাদেশের লক্ষ্য থাকা উচিত শুধু জয় নয়, বরং লড়াইয়ের মান উন্নত করা। কারণ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে দলটির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতের ম্যাচগুলোর জন্য তা হবে বড় প্রেরণা।
গোয়াহাটির আবহাওয়া আজ ক্রিকেটের উপযোগী থাকছে বলে জানা গেছে। বৃষ্টির আশঙ্কা নেই, ফলে পূর্ণ ৫০ ওভারের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পিচ রিপোর্ট অনুযায়ী, এটি কিছুটা ব্যাটিং সহায়ক হলেও স্পিনারদের জন্যও সুযোগ তৈরি হতে পারে— যা বাংলাদেশের মতো স্পিন নির্ভর দলের জন্য ইতিবাচক খবর।
বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আজ তাকিয়ে থাকবে নিগার সুলতানার দলের দিকে। ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে যদি দলটি নিজেদের সেরা খেলাটা উপহার দিতে পারে, তবে সেটি শুধু পয়েন্ট টেবিলে নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের দিক থেকেও হবে এক বিশাল অর্জন।
শেষ পর্যন্ত ফলাফল যাই হোক, এই ম্যাচটি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের উন্নতির আরেকটি পদক্ষেপ হয়ে থাকবে। কারণ পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় যেমন ছিল স্বপ্নের সূচনা, তেমনি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি হতে পারে নিজেদের সামর্থ্য যাচাইয়ের বাস্তব পরীক্ষা। গোটা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা তাই আজ একটাই প্রত্যাশা করছেন— লাল-সবুজের মেয়েরা যেন তাদের সাহস, আত্মবিশ্বাস ও লড়াইয়ের মনোভাব দিয়ে আবারও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে গর্বিত করে তুলতে পারে।