প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
স্পেন ও বার্সেলোনার কিংবদন্তি লেফট-ব্যাক জর্দি আলবা অবশেষে ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিলেন। দীর্ঘ ১৮ বছরের ঝলমলে পেশাদার ফুটবল জীবনের পর ইন্টার মিয়ামির এই তারকা জানিয়ে দিয়েছেন, চলতি মৌসুম শেষে তিনি আর মাঠে নামবেন না। মঙ্গলবার এক আবেগঘন ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ৩৬ বছর বয়সী এই তারকা ফুটবলার জানিয়েছেন, সময় এসেছে জীবনের এক মহৎ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি টানার।
আলবার ক্যারিয়ারটি ফুটবলের সৌন্দর্য, আবেগ এবং অগণিত সফলতার এক প্রতিচ্ছবি। বার্সেলোনার ঘর থেকে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলারটি এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্লাবটির হয়ে ডিফেন্সে ছিলেন অটল এক প্রাচীরের মতো। স্পেন জাতীয় দলের জার্সিতে ইউরো জয়, বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগসহ প্রায় সব সম্ভাব্য ট্রফি জেতা—সব মিলিয়ে আলবার ক্যারিয়ার ফুটবলের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
নিজের বিদায়ী পোস্টে আলবা লিখেছেন, “আমাদের জীবনের খুবই অর্থবহ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি টানার সময় এসেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই মৌসুমের শেষে আমার পেশাদার ফুটবল জীবনের ইতি টানব। আমি এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি একান্ত শান্তি, বিশ্বাস ও আনন্দের সঙ্গে। কারণ আমি জানি, আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলেছি এবং এখন সময় এসেছে জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখার।”
তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন নিজের দীর্ঘ ফুটবল যাত্রায় পাশে থাকা সবার প্রতি। সতীর্থ, কোচ, ক্লাব কর্মচারী, প্রতিপক্ষ এবং ভক্ত—সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলবা বলেন, “ফুটবল আমাকে সবকিছু দিয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ প্রত্যেকের প্রতি, যারা আমার পাশে ছিলেন, আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন, চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন এবং উন্নতির পথ দেখিয়েছেন।”
আলবার ফুটবল যাত্রা শুরু হয় কাতালোনিয়ার ছোট একটি ক্লাব, অ্যাটলেটিকো সেন্ট্রো হসপিটালেন্সে-তে। সেখান থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা জন্ম নেয়। পরে তিনি কুর্নেলিয়া এবং নাসতিক দে তাররাগুনার হয়ে খেলেন, যেখানে তিনি পেশাদার ফুটবলের কঠিন বাস্তবতা শিখে নেন। এরপর ভ্যালেন্সিয়া সিএফ-এর জার্সিতে প্রথমবারের মতো স্পেনের শীর্ষ লিগে অভিষেক ঘটে তার, যা তার স্বপ্নপূরণের সূচনা করে।
২০১২ সালে তিনি যোগ দেন তার শৈশবের ভালোবাসা, এফসি বার্সেলোনায়। এই ক্লাবেই আলবা নিজের ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটান। লিওনেল মেসির সঙ্গে তার দুর্দান্ত বোঝাপড়া, নেমারের সঙ্গে উইং-লিঙ্কআপ এবং সার্জিও বুসকেটসের সঙ্গে নিখুঁত সমন্বয় ফুটবলপ্রেমীদের চোখে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। বার্সেলোনার হয়ে ৬টি লা লিগা, ৫টি কোপা দেল রে, ১টি চ্যাম্পিয়নস লিগসহ অগণিত শিরোপা জয় করেন আলবা।
নিজের প্রিয় ক্লাবকে স্মরণ করে আলবা লিখেছেন, “বার্সেলোনা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ক্লাব আমাকে শিশু বয়স থেকে বড় করেছে, গড়ে তুলেছে এবং আমাকে স্বপ্নের উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এখানে আমি ফুটবলের সবকিছু শিখেছি—প্রেম, অধ্যবসায়, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগ।”
ক্লাব ফুটবলের বাইরেও আলবার নাম উজ্জ্বল হয়েছে স্পেন জাতীয় দলের হয়ে। ২০১২ সালের ইউরো ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে তার করা স্মরণীয় গোলটি আজও ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে তিনি খেলেছেন ৯৩টি ম্যাচ, করেছেন ৯টি গোল এবং ২টি বড় শিরোপা জিতেছেন।
২০২৩ সালে বার্সেলোনার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে আলবা যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মিয়ামি সিএফ-এ। সেখানে তিনি আবারও একত্রিত হন তার বার্সেলোনা সময়ের তিন প্রিয় সতীর্থ—লিওনেল মেসি, সার্জিও বুসকেটস ও লুইস সুয়ারেসের সঙ্গে। মিয়ামিতে তাদের উপস্থিতি শুধু ক্লাবের মান বাড়ায়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলকেও নতুন করে প্রাণ দিয়েছে।
ইন্টার মিয়ামিকে নিয়ে আলবা বলেন, “ধন্যবাদ ইন্টার মিয়ামিকে—আমার জন্য দরজা খুলে দেওয়ার জন্য, শেষ সময় পর্যন্ত সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়ার জন্য। এই ক্লাব আমাকে আবারও ফুটবলের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ দিয়েছে। সমর্থকদের ভালোবাসা আমি হৃদয়ে চিরদিন ধরে রাখব।”
আলবা মূলত ২০২৭ সাল পর্যন্ত মিয়ামির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা এবং শারীরিকভাবে কিছুটা ক্লান্তির কারণে তিনি চুক্তির মেয়াদ শেষ না করেই অবসরের সিদ্ধান্ত নেন। সূত্র অনুযায়ী, অবসরের পর তিনি ফুটবল প্রশাসন, বিশ্লেষণ বা কোচিং পেশায় যুক্ত হতে পারেন।
ফুটবলবিশ্বে আলবার বিদায় এক আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। বার্সেলোনার বর্তমান সভাপতি জোয়ান লাপোর্তা বলেছেন, “জর্দি আলবা শুধু একজন ডিফেন্ডার ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণা। মাঠে তার নিষ্ঠা ও একাগ্রতা আমাদের সকলের জন্য শেখার বিষয়।” লিওনেল মেসিও সামাজিক মাধ্যমে সাবেক সতীর্থকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছেন, “তুমি শুধু একজন সতীর্থ নও, তুমি আমার ভাই। ফুটবল তোমাকে মনে রাখবে, যেমন আমি রাখব।”
জর্দি আলবার এই বিদায় ফুটবলের ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও, তার স্মৃতি, অবদান এবং উত্তরাধিকার চিরকাল বেঁচে থাকবে। এক নিবেদিতপ্রাণ খেলোয়াড়, যিনি নিজের প্রতিটি ম্যাচে আবেগ ঢেলে দিয়েছেন—তার এই বিদায় যেন ফুটবলের প্রতি ভালোবাসারই এক চিরন্তন উদাহরণ হয়ে থাকবে।
ফুটবল হয়তো তার বুটজোড়া হারালো, কিন্তু জর্দি আলবা চিরকাল ফুটবলের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।