১৩ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যা ৪০, ধর্ষণ ৬৮৭: অধিকার-এর প্রতিবেদনে নতুন প্রশ্ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫২ বার
১৩ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যা ৪০, ধর্ষণ ৬৮৭: অধিকার-এর প্রতিবেদনে নতুন প্রশ্ন

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত ১৩ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। সংগঠনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে এই ঘটনাগুলো ঘটে। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসেই এমন ১১টি হত্যার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। তিন দিন পর, ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, ক্ষমতা পরিবর্তনের পরপরই দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টানাপোড়েন দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে অধিকার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

৩০ অক্টোবর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি অধিকার সংস্থার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ, সহযোগী মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত ১৩ মাসে ৪০ জন মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জনকে গুলি করে, ১৪ জনকে নির্যাতন করে এবং সাতজনকে হেফাজতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে এমন ১১টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সাতজনকে যৌথবাহিনী, তিনজনকে পুলিশ এবং একজনকে সেনা সদস্যদের হাতে নিহত বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহতদের মধ্যে তিনজনকে নির্যাতনের মাধ্যমে, ছয়জনকে গুলি করে এবং দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এই তিন মাসে অন্তত ২৭ জন বন্দি কারাগারে মারা গেছেন, ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকালীন সময়ে কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ জনে। মানবাধিকার সংগঠনটি বলছে, কারাবন্দিদের মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়া ও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ঘটছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতনের অভিযোগও এসেছে।

অধিকার-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে অন্তত ৩৫ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরেই বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারান ১০ জন বাংলাদেশি নাগরিক। এছাড়া গত মে মাস থেকে ভারত অন্তত ২,৩৩৩ জন বাংলাদেশিকে বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে দেশে ঠেলে দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

মানবাধিকার পরিস্থিতির এই চিত্র কেবল বিচারবহির্ভূত হত্যায় সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক সহিংসতাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সংঘর্ষে অন্তত ২৮১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসেই নিহত হয়েছেন ৪৬ জন।

নারী ও কিশোরীদের প্রতি সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ৬৮৭ নারী ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১৮৮টি ঘটনা ঘটেছে চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এছাড়া এই সময়ে ১৫৩ জন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৫টি ঘটনা ঘটেছে গত তিন মাসে।

অধিকার তার প্রতিবেদনে বলেছে, “অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে মৃত্যু, নারী নির্যাতন ও রাজনৈতিক সহিংসতা—সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।”

সংস্থাটি আরও বলেছে, “যদিও সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।” অধিকার সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার।

অধিকারের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান বলেন, “যেকোনো সরকার যদি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়, তবে মানবাধিকার পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। আমরা দেখছি, অতীতের ধারাবাহিকতা এখনো ভাঙা যায়নি।”

অন্যদিকে সরকারপন্থী কিছু বিশ্লেষক বলেছেন, এই প্রতিবেদনটি একতরফা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা আগের সরকারের সময়ের তুলনায় কমেছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সম্প্রতি বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত হবে ‘ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রতিবেদনটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তারা মনে করেন, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে সরকারের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।

অধিকার প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই প্রতিবেদন সরকারের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রকৃত প্রতিফলন, আবার কেউ বলছেন, এটি সরকারবিরোধী একটি প্রচারণার অংশ।

তবে নাগরিক সমাজের নেতারা বলছেন, সংখ্যার হিসাব যাই হোক না কেন, একটি মৃত্যুও যদি বিচারবহির্ভূত হয়, তা রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ। তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করতে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালীন ১৩ মাসের মানবাধিকার চিত্র এই প্রতিবেদনে যেমনভাবে ফুটে উঠেছে, তা বাংলাদেশের আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জকেও সামনে এনেছে। ভবিষ্যতে সরকার এই অভিযোগগুলো কীভাবে মোকাবিলা করে, তা-ই নির্ধারণ করবে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির দিকনির্দেশনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত