প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দীর্ঘ নয় মাস বন্ধ থাকার পর শনিবার (১ নভেম্বর) থেকে পর্যটকদের জন্য আবারও খুলে দেওয়া হচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সরকার জানিয়েছে, এই দ্বীপের নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে এবার থেকে সেন্টমার্টিনে ভ্রমণ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হবে। প্রতিদিন সর্বাধিক দুই হাজার পর্যটক দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। তবে, ভ্রমণকারীদের জন্য ১২টি কঠোর নির্দেশনা মানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ, প্লাস্টিক ব্যবহার সীমিতকরণ এবং প্রবাল বা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধে নানা শর্ত।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে নভেম্বর মাসে শুধুমাত্র দিনের বেলায় পর্যটকরা ভ্রমণ করতে পারবেন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিতভাবে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হবে, তবে ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটক যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। টিকিট কিনতে হবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমোদিত অনলাইন পোর্টাল থেকে, যাতে যাত্রীর সংখ্যা ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা যায়।
পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, আগের মতোই কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনে যাবে। তবে, পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় এবার উখিয়ার ইনানী থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার অনুমতি নেই। গত ২৭ অক্টোবর পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে নীতিগত অনুমোদন সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়, যেখানে সেন্টমার্টিনে পর্যটক নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়।
দ্বীপে অবস্থানকালে রাতের বেলায় সৈকতে আলো জ্বালানো, সাউন্ড সিস্টেম বাজানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি আয়োজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ এসব কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন, পাখির আবাসস্থল ও প্রবালপ্রাচীরের জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। কেয়াবনে প্রবেশ করা, কেয়া ফল সংগ্রহ বা বিক্রয়, রাজকাঁকড়া, প্রবাল, শামুক-ঝিনুক কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক জীবের ক্ষতি করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইক বা অন্য কোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ থাকবে।
সরকার সেন্টমার্টিনকে ‘প্লাস্টিকমুক্ত দ্বীপ’ ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিয়েছে। এতে পলিথিন ব্যাগ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক প্যাকেট, চিপসের মোড়ক, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান বা শ্যাম্পুর ছোট প্যাকেট, এবং ছোট বোতলের পানীয় বহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পর্যটকদের নিজেদের পানির বোতল বা ফ্লাস্ক বহনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো যায়।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানায়, সেন্টমার্টিনে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে থাকবে পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, পুলিশ, কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা। এই কমিটি প্রতিদিন ভ্রমণ কার্যক্রম তদারকি করবে, নিয়ম লঙ্ঘন হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, “সেন্টমার্টিন আমাদের জাতীয় সম্পদ। আমরা পর্যটনকে উৎসাহিত করতে চাই, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে নয়। নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।”
স্থানীয়দের মধ্যে দ্বীপ খোলার খবর আনন্দের পাশাপাশি উদ্বেগও সৃষ্টি করেছে। তারা বলছেন, পর্যটন খাত সচল হলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়বে, তবে নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হলে দ্বীপের পরিবেশ আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্বীপের হোটেল মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা চাই পর্যটক আসুক, তবে সবাই যেন নিয়ম মেনে চলে। প্রকৃতি রক্ষা করলে তবেই পর্যটন টেকসই হবে।”
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সরকারের পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠন বেলা’র প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “দ্বীপ রক্ষায় নিয়ন্ত্রিত পর্যটনই সঠিক পথ। সেন্টমার্টিনে প্রকৃত ‘ইকোট্যুরিজম’ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে প্রকৃতি ও পর্যটন একসঙ্গে টিকে থাকতে পারে।”
গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক দশকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের প্রবালস্তর প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়েছে। অতিরিক্ত পর্যটক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সমুদ্র দূষণ এর প্রধান কারণ। তাই এবার সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে বিশেষজ্ঞরা ‘দ্বীপ বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ’ হিসেবে দেখছেন।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যে দ্বীপে ‘স্মার্ট ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে অনলাইন নিবন্ধন, অবস্থান ট্র্যাকিং ও পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর অবকাঠামো স্থাপন করা হবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেন্টমার্টিনে আবারও পর্যটক পা রাখবেন, তবে এবার প্রকৃতির সুরক্ষাই হবে ভ্রমণের মূল বার্তা। দ্বীপের নীল জলরাশি, প্রবালের নীরব সৌন্দর্য ও সমুদ্রের প্রাণবৈচিত্র্য যেন বেঁচে থাকে, সেটিই এখন সবার অভিন্ন লক্ষ্য।