প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ছোট পর্দার জনপ্রিয় মুখ মুমতাহিনা চৌধুরী টয়া আবারও অভিনয়ে ফিরছেন নতুন উদ্যম ও নতুন দর্শন নিয়ে। একসময় যিনি নিয়মিত নাটকে অভিনয় করে দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছেন, সেই টয়া এখন অনেকটাই বেছে বেছে কাজ করছেন। দীর্ঘ বিরতির পর তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এখন আর সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটতে চান না। বরং তাঁর লক্ষ্য এমন কাজ করা, যা দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাবে এবং তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ দেবে।
২০১০ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়ায় যাত্রা শুরু হয় টয়ার। সেই প্রতিযোগিতার মঞ্চ থেকেই তিনি আলোচনায় আসেন এবং পরবর্তী সময়ে নাটক, বিজ্ঞাপন ও উপস্থাপনায় নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন। টয়ার অভিনয়ে ছিল স্বাভাবিকতা, আর এই স্বাভাবিক অভিনয়শৈলীর কারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন।
তবে গত কয়েক বছরে তাঁকে তুলনামূলক কম দেখা গেছে। অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়তো অভিনয় থেকে সরে গেছেন। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে প্রায় দুই বছর পর তিনি নতুন নাটক গোলাপ আর কাঁটা-এর মাধ্যমে আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। রাজধানীর উত্তরায় সম্প্রতি নাটকটির শুটিংয়ে অংশ নেন তিনি। নাটকটি পরিচালনা করেছেন অভিজ্ঞ নির্মাতা ফেরদৌস হাসান। এতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন রাশেদ জামান শাওন।
নাটকের গল্পে তুলে ধরা হয়েছে একটি দাম্পত্য সম্পর্কের সূক্ষ্ম আবেগ, ভালোবাসা, অভিমান এবং প্রজন্মগত চিন্তার পার্থক্য। একই সঙ্গে এতে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে। নাটকটিতে আরও অভিনয় করেছেন বরেণ্য অভিনেতা আবুল হায়াত এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী দিলারা জামান। তাঁদের মতো অভিজ্ঞ শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা টয়ার কাছে ছিল বিশেষ আনন্দের।
অভিনয়ে ফিরে আসার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে টয়া বলেন, দীর্ঘদিন পর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি অন্যরকম ভালো লাগা অনুভব করেছেন। তাঁর ভাষায়, অনেক দিন পর এমন একটি টিমের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, যেখানে সবাই আন্তরিক এবং কাজের প্রতি নিবেদিত। তিনি বলেন, কাজ করতে করতে কখন সময় কেটে গেছে বুঝতেই পারেননি। এই নাটকটি আসন্ন ঈদ উপলক্ষে নির্মিত হয়েছে এবং এটি দর্শকদের জন্য একটি বিশেষ উপহার হবে বলে তিনি আশা করছেন।
অভিনয় থেকে কিছুদিন বিরতি নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টয়া খোলামেলা কথা বলেন। তিনি জানান, একসময় তাঁর মনে হয়েছিল অভিনয়ে একঘেয়েমি চলে এসেছে। একই ধরনের চরিত্র বারবার করতে গিয়ে নিজের মধ্যেই ক্লান্তি তৈরি হয়েছিল। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন কিছুদিন বিরতি নেওয়ার। এই সময়টাতে তিনি নিজের পরিবারকে সময় দিয়েছেন এবং নিজের ভেতরের শিল্পীকে নতুনভাবে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, তাঁর কাছে সংখ্যার চেয়ে কাজের মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এখন এমন কাজ করতে চান, যা দর্শকের মনে জায়গা করে নেবে। তাঁর কথায়, এখন আর শুধুমাত্র জনপ্রিয় হওয়ার জন্য কাজ করতে চান না। তিনি চান তাঁর কাজের মাধ্যমে মানুষ তাঁকে নতুনভাবে চিনুক এবং তাঁর অভিনয়ের গভীরতা উপলব্ধি করুক।
টয়া আরও জানান, ঈদের নাটকে সীমিতভাবে দেখা গেলেও তিনি উপস্থাপনায় সক্রিয় থাকবেন। বিভিন্ন বিশেষ অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় তাঁকে দেখা যাবে। পাশাপাশি নিজের ইউটিউব চ্যানেল নিয়েও নতুন পরিকল্পনা করছেন তিনি। ডিজিটাল মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে চান এবং নিজের ভাবনা ও সৃজনশীলতাকে নতুনভাবে তুলে ধরতে চান।
ছোট পর্দায় নিয়মিত কাজ করলেও বড় পর্দায় টয়ার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। তবে তিনি ইতোমধ্যে চলচ্চিত্রে নিজের সম্ভাবনার প্রমাণ দিয়েছেন। সর্বশেষ তিনি অভিনয় করেছেন বেঙ্গলি বিউটি চলচ্চিত্রে, যেখানে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। এই সিনেমার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, সুযোগ পেলে বড় পর্দাতেও তিনি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে সক্ষম।
বর্তমানে নতুন কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছেন টয়া। তবে তিনি তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না। চিত্রনাট্য ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে, চরিত্রের গভীরতা বুঝে তবেই নতুন সিনেমায় অভিনয়ের সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, একটি ভালো গল্প এবং শক্তিশালী চরিত্র একজন অভিনেতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
টয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর অভিনয় জীবনের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি এখন আর শুধুমাত্র কাজের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগী নন, বরং কাজের মান ও নিজস্ব তৃপ্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। এই পরিবর্তন তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত পরিপক্বতার প্রতিফলন।
দর্শকরাও টয়ার এই প্রত্যাবর্তনের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। কারণ দীর্ঘদিন পর তিনি যখন নতুনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশাও অনেক বেশি। টয়া নিজেও সেই প্রত্যাশা সম্পর্কে সচেতন। তাই তিনি ধীরে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে চান।
বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে টয়া একটি পরিচিত নাম। তাঁর অভিনয়ে রয়েছে এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা, যা দর্শককে সহজেই আকৃষ্ট করে। এখন তিনি যখন নতুনভাবে নিজের পথচলা শুরু করছেন, তখন অনেকেই বিশ্বাস করছেন তাঁর সামনে আরও বড় সাফল্য অপেক্ষা করছে।
নিজের এই নতুন যাত্রা সম্পর্কে টয়া আশাবাদী। তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর জীবনে বিরতি কখনো কখনো প্রয়োজন হয়। কারণ সেই বিরতি তাঁকে নতুন করে ভাবতে এবং নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করতে সাহায্য করে। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও পরিণত করে এবং তাঁর কাজের গভীরতা বাড়ায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, টয়ার এই প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র অভিনয়ে ফেরা নয়, বরং একজন শিল্পীর নতুন দর্শন নিয়ে ফিরে আসা। যেখানে জনপ্রিয়তার চেয়ে শিল্পের মূল্য বেশি, আর সংখ্যার চেয়ে মানই হয়ে উঠেছে তাঁর প্রধান লক্ষ্য।