অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৭ বার
অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি পুনর্বিবেচনার আহ্বান

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং সুশাসনের প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত সম্ভাব্য দুর্নীতি, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং বিদেশি চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ ট্রানজিশন টিম বা উত্তরণকালীন দল গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং নতুন সরকারের সামনে প্রকৃত আর্থিক চিত্র তুলে ধরতে এই উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ অনুষ্ঠিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন তিনি। এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। ব্রিফিংয়ে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম বা স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল কি না তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, একটি ট্রানজিশন টিম গঠন করে প্রাথমিক তদন্ত ও বিশ্লেষণ করলে ভবিষ্যতে সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। এই টিমে সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। প্রয়োজনে এই টিম ফরেনসিক তদন্তও পরিচালনা করতে পারবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। অনেক দেশে সরকার পরিবর্তনের সময় নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার আগে পূর্ববর্তী সময়ের চুক্তি, আর্থিক দায় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এর ফলে নতুন সরকার তাদের সামনে থাকা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায় এবং সেই অনুযায়ী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে।

বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পাদিত বিভিন্ন বিদেশি ক্রয় ও বৈদেশিক চুক্তি পুনর্বিবেচনার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, এসব চুক্তির অনেক বিষয় এখনো পুরোপুরি জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। ফলে নতুন সরকারের ওপর কী ধরনের আর্থিক দায় বর্তাবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ কীভাবে প্রভাবিত হবে, তা বোঝার জন্য এই চুক্তিগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে একাধিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে, যেগুলোর প্রভাব বহুমাত্রিক হতে পারে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই ট্রানজিশন টিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে একটি ‘ব্লু বুক’ তৈরি করা। এই ব্লু বুকের মাধ্যমে সরকারের প্রকৃত দায়-দেনা, বিদ্যমান আর্থিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। তিনি মনে করেন, দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই এই প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব এবং সেটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সময়সীমা।

এদিকে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম চলতি অর্থবছরের জন্য দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত সংশোধিত বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে। অনুষ্ঠানে সামষ্টিক অর্থনীতির বেঞ্চমার্ক বিষয়ক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তৌফিকুল ইসলাম খান, যিনি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রতিবেদনে বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একসঙ্গে তিনটি বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নাজুক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বল অবস্থা এবং সীমিত রাজস্ব ও ব্যয়ের পরিসর।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই বাস্তবতায় সংশোধিত বাজেটে ঋণের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী নীতি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রয়োজনীয় খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব হয়।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, একটি নতুন সরকারের জন্য শুরুটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতেই যদি সঠিক নীতি ও দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সহজ হয়। অন্যথায় ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তাদের বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করেছে, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় বাড়ানো এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো লক্ষ্যগুলো অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। তাই এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বড় বিনিয়োগ প্রকল্প শুরু করার পরিবর্তে চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করা এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া বেশি যুক্তিযুক্ত হবে। একই সঙ্গে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর জন্য অতিরিক্ত সরকারি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সুপারিশগুলো শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য নয়, বরং দেশের সার্বিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে অতীতের সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণ করা অপরিহার্য।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের এই আহ্বান দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে। অন্যদিকে, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এ বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, কারণ এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তাদের ভবিষ্যৎ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের অর্থনৈতিক যাত্রাপথ নির্ভর করে তার নীতিনির্ধারণের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ওপর। সেই বিবেচনায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনার এই আহ্বান দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত