সহজ আমদানি ও ঋণ সুবিধা চান ব্যবসায়ীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৫ বার
সহজ আমদানি ও ঋণ সুবিধা চান ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। এই শহরের ব্যবসায়ী সমাজ দেশের শিল্প, আমদানি-রপ্তানি এবং বিনিয়োগ প্রবাহের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল এবং নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এখানকার ব্যবসায়ীদের মনে জেগেছে নতুন প্রত্যাশা। তাদের বিশ্বাস, নীতিগত পরিবর্তন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে স্থবির অর্থনীতিতে আবারও প্রাণ ফিরে আসতে পারে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বড় জয় পাওয়ার পর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের ব্যবসায়ী মহল অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের দিকে তাকিয়ে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে নানা সীমাবদ্ধতা, উচ্চ সুদের হার, জটিল আমদানি প্রক্রিয়া এবং নীতিগত অনিশ্চয়তায় ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা এখন নতুন সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন।

চট্টগ্রামের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী পিএইচপি গ্রুপ-এর পরিচালক মোহাম্মদ আকতার পারভেজ বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ নীতি অনুসরণ করা জরুরি। তার মতে, ব্যবসা শুরু করা, আমদানি-রপ্তানি করা এবং বিনিয়োগ পরিচালনার ক্ষেত্রে যদি প্রশাসনিক জটিলতা কমানো যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নতুন সরকার ইতোমধ্যে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে, যা ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

একই ধরনের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন দেশের অন্যতম ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাত-এর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বর্তমানে ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং কঠোর শর্ত বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক ঋণের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনলে নতুন শিল্প স্থাপন এবং পুরোনো শিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরাও একই সুরে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, আমদানি প্রক্রিয়ায় এলসি মার্জিনের হার বেশি হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে আমদানি করতে সাহস পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বাজারের অস্থিরতা, যা ব্যবসার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল না থাকলে আমদানি-রপ্তানির পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় ব্যবসাবান্ধব নীতির অভাবে দেশের বহু শিল্প-কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কারখানার উৎপাদন কমে গেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করতেও বাধ্য হয়েছে। এর ফলে কর্মসংস্থান কমেছে এবং বিনিয়োগের গতি থেমে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।

শুধু ঋণ নয়, শিল্প পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প এলাকার উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় যন্ত্রপাতি সচল রাখা সম্ভব হয় না, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা মনে করেন, শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়বে এবং রপ্তানিও বৃদ্ধি পাবে।

ব্যবসায়ীরা আরও বলেছেন, কর ও শুল্ক কাঠামো সংস্কার করা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে করের হার এবং প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় উদ্যোক্তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। হয়রানিমুক্ত ট্যাক্স ও ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করা গেলে ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে এবং রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে। তারা বিশ্বাস করেন, স্বচ্ছ ও সহজ কর ব্যবস্থা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার অন্যতম প্রধান শর্ত।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। এই খাতের প্রবৃদ্ধি ছাড়া সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। তারা মনে করেন, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

চট্টগ্রামের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নীতির ধারাবাহিকতা চান। কারণ, ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন ব্যবসার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। তারা চান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করা হোক, যাতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন।

নতুন সরকারের প্রতি ব্যবসায়ীদের এই প্রত্যাশা শুধু তাদের নিজেদের স্বার্থেই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও জড়িত। শিল্প ও বাণিজ্যের গতি বাড়লে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, রপ্তানি আয় বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। তাই ব্যবসায়ীরা এখন অপেক্ষা করছেন, নতুন সরকার তাদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজের এই প্রত্যাশা মূলত একটি ইতিবাচক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। তারা বিশ্বাস করেন, সঠিক নীতি এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও বিনিয়োগ এবং শিল্পোন্নয়নের নতুন দিগন্তে পৌঁছাতে পারবে। নতুন সরকারের সামনে তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত