ঈদের আগে ১৪ হাজার কোটি ঋণ চায় পোশাক খাত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ বার
পোশাক খাত ঋণ সহায়তা সংকট

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের তৈরি পোশাক খাত আবারও বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও উৎসব বোনাস সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করতে সহজ শর্তে ১৪ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ সহায়তা চেয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই সহায়তা না পেলে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সংগঠনটির প্রতিনিধি দল গভর্নর আহসান এইচ মনসুর-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দাবি উত্থাপন করেন। বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শিহাব উদ্দুজা চৌধুরী বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে মাসিক বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। ঈদের আগে দুই মাসের সমপরিমাণ অর্থের প্রয়োজন পড়ে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। তাই সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া হলে শিল্পকারখানাগুলো সময়মতো শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করতে পারবে।

তিনি জানান, গভর্নর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন এবং খাতটির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা রপ্তানি প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় করার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এই অর্থ দ্রুত ছাড় হলে কারখানাগুলোর নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনা সাময়িকভাবে স্বস্তি পাবে এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।

পোশাক খাতের নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণে শিল্পটি চাপের মুখে রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ, নির্বাচনঘিরে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন—সব মিলিয়ে রপ্তানি প্রবণতা গত সাত মাস ধরে ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর শুল্ক নীতির প্রভাবসহ বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা ওঠানামা পোশাক রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।

সংগঠনটির চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনা আবেদন লিয়েন ব্যাংকে জমা রয়েছে, কিছু ফাইল অডিটের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক-এ প্রক্রিয়াধীন এবং কিছু আবেদন সব ধাপ শেষ হলেও অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় আছে। এসব অর্থ দ্রুত ছাড় করা গেলে কারখানাগুলো তাদের চলমান ব্যয়, কাঁচামাল ক্রয় এবং শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে বড় ধরনের স্বস্তি পাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত মোট প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ছাড় করা হয়েছে। তবে বস্ত্র ও পোশাক খাতে এখনো প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা আটকে রয়েছে, যা দ্রুত ছাড় করার দাবি জানিয়েছে শিল্প মালিকদের সংগঠন। তাদের মতে, এই অর্থ ছাড় না হলে উৎপাদনচক্রে ধীরগতি দেখা দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সময়মতো সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রস্তাবিত ঋণ সুবিধা তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১২ মাসে পরিশোধের সুযোগ রাখতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা স্বল্পমেয়াদি চাপ কাটিয়ে ধীরে ধীরে আর্থিক ভারসাম্যে ফিরতে পারেন। পাশাপাশি প্রচলিত ঋণসীমার বাইরে বিশেষ বিবেচনায় সফট লোন চালু, প্যাকিং ক্রেডিট পুনরায় কার্যকর এবং সুদের হার সাত শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা করা এবং তহবিলের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ায় এ খাতের স্থিতিশীলতা জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক গতিপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এই শিল্পে কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের আয় পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে ঈদের আগে বেতন-ভাতা পরিশোধে বিলম্ব হলে তা শুধু শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় নয়, বাজারব্যবস্থা ও ভোগব্যয়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও সময়মতো বেতন-বোনাস পরিশোধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বলছেন, উৎসবের সময় শ্রমিকরা পরিবারের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিকল্পনা করে থাকেন। যদি এই সময় আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতে এমন পরিস্থিতি শ্রম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে বলেও তারা স্মরণ করিয়ে দেন।

উদ্যোক্তারা দাবি করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক হলেও দ্রুত নীতিগত সহায়তা না পেলে তা দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নিতে পারে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা জরুরি, আর তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ। ব্যাংকঋণ সহজ শর্তে পাওয়া গেলে তারা কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিক বেতন এবং পরিচালন ব্যয় নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারবেন।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তৈরি পোশাক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় থাকতে পারে। অন্যদিকে সহায়তা বিলম্বিত হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সব মিলিয়ে ঈদকে সামনে রেখে পোশাক খাতের এই আর্থিক সহায়তার আবেদন শুধু একটি শিল্পের দাবি নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন নজর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ এলে শিল্প মালিক, শ্রমিক এবং অর্থনীতির জন্য তা বড় স্বস্তির বার্তা হয়ে আসতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত