প্রকাশ: ৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঈদের প্রাক্কালে আবারও কর্মচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লিগুলো। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার তাঁতিরা। তাঁত শ্রমিকদের তৈরি প্রতিটি শাড়িতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক ও শৈল্পিক কারুকাজ, যা ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। দীর্ঘদিন পর কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি আয়ে খুশি হয়েছেন তাঁতকারিগণ।
ঈদের মৌসুম এলেই সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লিগুলোতে কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া ও এনায়েতপুরের তাঁত পল্লি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বুননের খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে। এখানে রাতদিন এক করে শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে, যা পাইকারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। শ্রমিকরা জানান, দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে উঠে আবার কর্মমুখর হয়ে ওঠার আনন্দ তাদের মুখে ফুটেছে।
বেলকুচি তাঁত পল্লীর শ্রমিক সাইদুল ইসলাম বলেন, “ঈদ উপলক্ষে এবার কারখানায় বাহারি নাম ও নতুন ডিজাইনের উন্নতমানের জামদানি, সুতি জামদানি, কাতান, বেনারসি সহ বিভিন্ন ধরনের শাড়ি তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি শাড়িতে নতুন নকশা ও কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করবে।”
তাঁত মালিক বৈদ্দনাথ রায় উল্লেখ করেন, “বর্তমানে তাঁতশিল্পে মন্দাভাব চলছে। তবে ঈদকে কেন্দ্র করে শ্রমিকরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। শাড়ি তৈরির প্রধান কাঁচামাল—রং ও সুতার বাজার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে জেলার ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।”
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, “জেলার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অপরিহার্য। সরকারের সুনজর পেলে এই শিল্প আবারও শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।”
সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত। জেলায় পাওয়ারলুম ও হ্যান্ডলুম মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ৫ লাখ তাঁত। এটি শুধু এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি নয়, বরং দেশের হস্তশিল্প ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
ঈদের আগের এই কর্মব্যস্ততা শুধু শ্রমিকদের অর্থনৈতিক স্বস্তি এনে দিচ্ছে না, বরং তাঁত শিল্পকে নতুন প্রাণদান করছে। দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকা চাহিদা এবং শিল্পে মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে শ্রমিকরা দিনরাত এক করে কাজ করছেন। প্রতিটি শাড়ির কারুকাজে ফুটানো নকশা ও বুনন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়াচ্ছে।
শ্রমিকরা জানান, কর্মচাঞ্চল্য বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই জীবিকা নিশ্চয়তা বেড়েছে। বিশেষ করে ঈদের আগে তাদের আয় অন্যান্য সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। তাঁতশিল্পের এই সময়ে কর্মজীবীরা নতুন ডিজাইন ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত করছেন।
তাঁত মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁচামাল সরবরাহে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও শ্রমিকদের উদ্যম এবং ক্রেতার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ চলছেই। শাড়ির মান ও নকশা উন্নত করার জন্য নতুন ধরনের সুতা ও রং ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে, সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লি পুনরায় অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্প শুধুমাত্র স্থানীয় অর্থনীতি নয়, দেশের হস্তশিল্প ও সংস্কৃতি ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কাঁচামাল সহজলভ্যতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লির শ্রমিকরা জানাচ্ছেন, ঈদের মৌসুমে এই কর্মব্যস্ততা তাদের জীবনের এক উৎসবের মতো। দীর্ঘদিন ধরে যে মন্দাভাব অনুভব করেছিলেন, এবার তা কাটিয়ে ওঠার আনন্দ মুখে ফুটেছে। তাঁত পল্লির প্রতিটি কোণে বুননের খটখট শব্দ, নতুন নকশার শাড়ি, এবং শ্রমিকদের উদ্যম মিলে এক সুন্দর কর্মমুখর দৃশ্য তৈরি করেছে।
তাঁত শিল্পের এই পুনরুজ্জীবনের ফলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হচ্ছে, পরিবারগুলো স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং জেলার অর্থনীতি আরও সক্রিয় হচ্ছে। ঈদের পরে যে চাহিদা তৈরি হবে, তা কেবল স্থানীয় বাজার নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শাড়ি পৌঁছে দেবার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লি আবারও তার ঐতিহ্য রক্ষা করছে, শ্রমিকদের উদ্যম ও সরকারের সহায়তায় এই শিল্প ভবিষ্যতেও সমৃদ্ধ হতে সক্ষম হবে। ঈদকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের রাতদিন এক করে কাজ করা, নতুন নকশা ও কারুকাজ তৈরি করা, এবং বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা, সব মিলিয়ে সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লি আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।