প্রকাশ: ৫ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বস্ত্র ও পাট খাতের পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার এখন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশেষত দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সরকারি পাটকলগুলো দ্রুত চালু করার জন্য তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সচিবালয়ে জাতীয় পাট দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকার কাঁচা পাট রফতানির পাশাপাশি দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা গ্রহণ করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট ভারতসহ অন্যান্য দেশে রফতানি হলেও বাংলাদেশের পাটকারখানাগুলো কাঙ্ক্ষিত মূল্যে লাভ করতে পারছে না। এই কারণে দেশীয় শিল্প কাঁচামালের ঘাটতিতে পড়েছে। অন্যদিকে, ভারত আমাদের কাঁচা পাট দিয়ে উচ্চমূল্যের ফিনিসড প্রোডাক্ট তৈরি ও রফতানি করে বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। আমরা চাই, বাংলাদেশও কাঁচা পাট রফতানি থেকে সরে এসে নিজের শিল্পে বিনিয়োগ করে উন্নত মানের পণ্য তৈরি করতে।”
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, বর্তমানে বিজেএমসির (বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন) অধীনে ২৫টি সরকারি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ইজারার মাধ্যমে ১৪টি ইতিমধ্যেই চালু করা হয়েছে। বাকী ৭টি পাটকল, যা রাজশাহী, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত, সেগুলো দ্রুত চালু করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন প্রক্রিয়ায় এগুলো চালু হলে দেশের পাট শিল্পে নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়বে।
জাতীয় পাট দিবসের উদ্বোধন আগামী শুক্রবার (৬ মার্চ) রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন অনলাইনে করবেন। দিবসটি উপলক্ষে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা চাই দেশের প্রতিটি নাগরিককে পাট খাতের গুরুত্ব এবং দেশীয় শিল্পের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন করা। পাট শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, এটি দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও জড়িত। আমাদের লক্ষ্য, পাট খাতকে শুধুমাত্র রফতানি উপকরণ হিসেবে নয়, বরং উচ্চমূল্যের তৈরি পণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করা।”
বাংলাদেশে পাট চাষ এবং পাটজাত পণ্য উৎপাদন দেশের কৃষি ও শিল্প খাতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি পাটকলগুলোর সঠিক কার্যক্রম না থাকায় দেশীয় উৎপাদন ও রফতানি দুটোই ব্যাহত হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগে শুধু শিল্প পুনরুজ্জীবন হবে না, বরং দেশের কৃষক সমাজও উপকৃত হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি পাটকল পুনরায় চালু হলে স্থানীয় কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন, কারণ কাঁচা পাটের বাজার স্থিতিশীল হবে এবং তারা তাদের পণ্য অধিক মূল্যে বিক্রি করতে পারবেন।
এছাড়া, পাট খাতের আধুনিকীকরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকার পরিকল্পনা করছে নতুন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের। প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, “আমরা চাই পাট শিল্পে শুধু উৎপাদন নয়, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাও নিশ্চিত করা। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব এবং এভাবে দেশীয় পাটজাত পণ্য আন্তর্জাতিক মানের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিযোগিতায় নামতে পারবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পাটকলগুলো পুনরায় চালু হলে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার আয়ও বাড়বে। বর্তমানে ভারত ও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পাটজাত পণ্যের রপ্তানি কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার সম্ভাবনা সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের এই পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
মানবিক দিক থেকেও এই উদ্যোগের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, “পাট খাত শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নয়, এটি দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। পাটের ব্যবহার এবং শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এটি দেশের যুব সমাজকে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে।”
সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, সরকার বন্ধ থাকা সরকারি পাটকলগুলো পুনরায় চালু করার মাধ্যমে কেবল শিল্প পুনরুজ্জীবন নিশ্চিত করতে চায় না, বরং দেশের কৃষক, কর্মী এবং অর্থনীতিকেও নতুন প্রাণ দিতে চায়। এ উদ্যোগ বাংলাদেশের পাট খাতকে আন্তর্জাতিক মানের ফিনিসড প্রোডাক্ট তৈরি করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
নতুন এই উদ্যোগে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের পাট শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং লাভজনক করে তোলা হবে। একই সঙ্গে কৃষকের জন্য একটি স্থিতিশীল বাজার তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে আরও মজবুত করবে।
বাংলাদেশের পাট খাতের এই পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া দেশের কৃষি ও শিল্প খাতের সংহতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জাতীয় পাট দিবস-২০২৬ উদযাপন ও সরকারের উদ্যোগের মাধ্যমে আশা করা যায়, বাংলাদেশের পাট শিল্প আবারও তার শিকড় থেকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।