প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান City Bank ইতিহাসে নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে। ২০২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার সমন্বিত মুনাফা করে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সাম্প্রতিক সভায় গত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ একীভূতভাবে ব্যাংকের মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১,৩২৪ কোটি টাকা, আর এককভাবে ব্যাংকের মুনাফা ১,৩০৫ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এই একক মুনাফা ছিল ১,০৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে ব্যাংকটি।
রেকর্ড মুনাফার পাশাপাশি ব্যাংকটি শেয়ারধারীদের জন্য ১৫ বছর পর আবারও বড় আকারের লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ২০২৫ সালের জন্য মোট ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া হবে, যার মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ এবং ১৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী করবে এবং ব্যাংকের শেয়ার বাজার অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।
ব্যাংকটির আয় কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মূল আয়ের বড় অংশ এসেছে ঋণের সুদ ও বিনিয়োগ খাত থেকে। গত বছর ব্যাংকটি ঋণের সুদ থেকে আয় করেছে ৫ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। তবে একই সময়ে আমানতের সুদ বাবদ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৮৬ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করেছে।
সুদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান কমে যাওয়ার পরও ব্যাংকটি বিনিয়োগ ও অন্যান্য আয়ের খাত থেকে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটি ৩ হাজার ৫৬২ কোটি টাকার আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। মোট বিনিয়োগ ও ফি-ভিত্তিক আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫০৬ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বাজারে তারল্য চাপ থাকা সত্ত্বেও সুশৃঙ্খল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী বিনিয়োগ কৌশলের কারণে ব্যাংকটি এই সাফল্য অর্জন করেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ড, ক্ষুদ্র ঋণ এবং রিটেইল ব্যাংকিং খাতেও ব্যাংকের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ২০২৫ সাল ছিল চ্যালেঞ্জিং একটি বছর, তবে সে সময়েও ব্যাংকটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তার মতে, মন্দ ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখা এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণেই ব্যাংকটি স্থিতিশীল মুনাফা অর্জন করতে পেরেছে। তিনি আরও জানান, ব্যাংকের প্রভিশন কভারেজ রেশিও বর্তমানে ১২৮ শতাংশ এবং শ্রেণীকৃত ঋণের হার মাত্র আড়াই শতাংশের কাছাকাছি, যা ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের শক্ত অবস্থান নির্দেশ করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতে সামগ্রিকভাবে গত বছর তুলনামূলক ভালো ব্যবসায়িক পরিবেশ বিরাজ করেছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের তারল্য শক্তিশালী ছিল এবং যেগুলো আস্থার সংকটে পড়েনি, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা যেমন বেড়েছে, তেমনি দক্ষ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিটি ব্যাংকের এই রেকর্ড মুনাফা শুধু একটি আর্থিক অর্জন নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ও পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যাংকটি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল সিটি ব্যাংকের জন্য একটি ঐতিহাসিক বছর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে একদিকে রেকর্ড মুনাফা, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় লভ্যাংশ—উভয়ই ব্যাংকটির শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির প্রতিফলন।