প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই উন্মাদনা, আবেগ আর কোটি মানুষের স্বপ্ন। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসরকে ঘিরে প্রতিবারই সমর্থকদের মধ্যে টিকিট পাওয়ার লড়াই শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। তবে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের New York City এবার দেখালো ভিন্ন এক চিত্র। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে বিশ্বকাপের আনন্দ পৌঁছে দিতে মাত্র ৫০ ডলারে ম্যাচের টিকিট দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসন। আর এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শহরের মেয়র Zohran Mamdani।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে নেওয়া এই বিশেষ উদ্যোগ ইতোমধ্যে নিউইয়র্কজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ যেখানে বিশ্বকাপের একটি টিকিট কিনতে অনেক সময় কয়েকশ থেকে হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হয়, সেখানে মাত্র ৫০ ডলারে ম্যাচ দেখার সুযোগ সত্যিই অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সীমিত সংখ্যক টিকিট বরাদ্দ করে সেগুলো লটারির মাধ্যমে বিতরণের পরিকল্পনা করেছে শহর প্রশাসন।
নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মোট এক হাজার টিকিট এই বিশেষ অফারের আওতায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ এবং দুটি নকআউট ম্যাচের টিকিট অন্তর্ভুক্ত থাকবে। নির্বাচিত ব্যক্তিরা দুটি করে টিকিট কেনার সুযোগ পাবেন। শুধু তাই নয়, ম্যাচ ভেন্যুতে যাওয়ার জন্য বিশেষ ফ্রি বাস সার্ভিসও রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে ইতোমধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে নিউইয়র্কে। বিশেষ করে টাইমস স্কয়ারে বিশাল বিলবোর্ড, ফুটবল থিমের সাজসজ্জা, বিভিন্ন দেশের পতাকা এবং সমর্থকদের ভিড়ে শহরটির পরিবেশ যেন বদলে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটক ও ফুটবলপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে নিউইয়র্কের রাস্তা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, এই উদ্যোগ শুধু টিকিট বিক্রির একটি আয়োজন নয়; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বকাপকে আরও বেশি ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সামাজিক প্রচেষ্টা। কারণ বিশ্বকাপের টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে অনেক ফুটবলপ্রেমীরই মাঠে বসে খেলা দেখার স্বপ্ন পূরণ হয় না।
শহরের এক বাসিন্দা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “বিশ্বকাপের টিকিট এখন সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। তাই ৫০ ডলারের এই উদ্যোগ মানুষকে আবারও ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করবে। এটা শুধু খেলা দেখা নয়, বরং শহরের মানুষকে একসঙ্গে উদযাপনের সুযোগ দেওয়া।”
আরেকজন বলেন, “আমি সত্যিকারের নিউইয়র্কার হিসেবে এই লটারিতে অংশ নেব। টিকিট পাওয়ার আশা করছি। বিশ্বকাপের মতো একটি আসর নিজের শহরে বসে উপভোগ করার সুযোগ জীবনে একবারই আসে।”
তবে সবাই পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। কারণ এই টিকিটগুলো সরাসরি বিক্রি না করে লটারির মাধ্যমে দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনেকের মন খারাপ। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ হাজার আবেদন নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে বিপুল সংখ্যক আবেদনকারীর মধ্যে টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হবে।
তবুও সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে। কারণ বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা খুব একটা দেখা যায় না। অনেকে মনে করছেন, এর মাধ্যমে নিউইয়র্ক প্রশাসন ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করতে চাচ্ছে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ এখন শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক আয়োজন। টিকিটের উচ্চমূল্য, স্পন্সরশিপ এবং পর্যটন শিল্পের কারণে বড় শহরগুলোতে বিশ্বকাপ আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়। কিন্তু সেই আয়োজনের সুবিধা সাধারণ মানুষ কতটা পায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। নিউইয়র্কের এই উদ্যোগ সেই বিতর্কের মধ্যেই নতুন এক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মেয়র জোহরান মামদানির জনপ্রিয়তা নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে তিনি বরাবরই আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তাকে ঘিরে সমালোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শক্ত সমর্থকগোষ্ঠীও। তবে বিশ্বকাপ টিকিট নিয়ে তার এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাচ্ছে।
এক নারী বাসিন্দা বলেন, “বিশ্বকাপ দেখতে এখন অনেক সময় মিলিয়নিয়ার হতে হয়। সাধারণ পরিবারের পক্ষে টিকিট কেনা কঠিন। তাই এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।”
আরেকজনের ভাষায়, “অনেকে মেয়র মামদানিকে নানা রাজনৈতিক তকমা দেন। কিন্তু এই উদ্যোগ প্রমাণ করে তিনি সাধারণ মানুষের কথাও ভাবেন। ফুটবল ভালোবাসা মানুষদের জন্য এটি দারুণ খবর।”
আগামী ২৫ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে লটারির আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। এরপর নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা করা হবে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই এটিকে “গোল্ডেন টিকিট” বলে অভিহিত করছেন। কারণ ভাগ্যবানদের জন্য এটি শুধু একটি ম্যাচ দেখার সুযোগ নয়, বরং বিশ্বকাপ ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগও।
ফুটবলবিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজনকে ঘিরে নিউইয়র্কের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এখন অন্য শহরগুলোর কাছেও উদাহরণ হয়ে উঠছে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বড় আন্তর্জাতিক আসরগুলোতে সাধারণ দর্শকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বেশি দেখা যেতে পারে।
বিশ্বকাপের উত্তেজনা যত বাড়ছে, নিউইয়র্কের মানুষের আগ্রহও তত বাড়ছে সেই কাঙ্ক্ষিত ৫০ ডলারের টিকিট ঘিরে। এখন শহরজুড়ে একটাই প্রশ্ন—কার হাতে উঠবে সেই সোনার টিকিট?