প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে আর্সেনালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপসেরার মুকুট জিতেছে প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (পিএসজি)। ফরাসি এই ক্লাবের ঐতিহাসিক জয়ে পুরো ফ্রান্স যখন উল্লাসে ভাসার কথা, তখন সেই আনন্দ রূপ নিয়েছে বিষাদ ও চরম সহিংসতায়। পিএসজির শিরোপা জয় উদযাপনের সময় ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ফুটবল সমর্থক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। রাতভর চলা এই সহিংসতা ও দাঙ্গার অভিযোগে ফ্রান্সজুড়ে চার শতাধিক উচ্ছৃঙ্খল সমর্থককে গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত এক স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ১-১ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে আর্সেনালকে পরাজিত করে লুইস এনরিকের শিষ্যরা। এর ঠিক ১২ মাস আগে মিউনিখে ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পিএসজি। এই ব্যাক-টু-ব্যাক শিরোপা জয়ের মাধ্যমে ইউরোপীয় ফুটবলের ৭১ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১০ম ক্লাব হিসেবে টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়ল তারা। ১৯৯৩ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যুগ শুরু হওয়ার পর রিয়াল মাদ্রিদের পর পিএসজিই দ্বিতীয় দল যারা নিজেদের মুকুট ধরে রাখতে সফল হলো। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পরপরই প্যারিসের রাস্তায় শঁজেলিজ-এ হাজার হাজার অন্ধ সমর্থক ফ্লেয়ার ও আতশবাজি ফুটিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন।
তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বিজয়োল্লাস রূপ নেয় চরম তাণ্ডবে। পার্ক দে প্রাঁস স্টেডিয়ামের বাইরে বড় পর্দায় খেলা দেখতে আসা কট্টর সমর্থকদের একাংশ পুলিশের ওপর চড়াও হলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। উন্মত্ত জনতা বেশ কিছু দোকানে ভাঙচুর চালায়, রাস্তায় ইলেকট্রিক বাইক ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং পুলিশের দিকে লক্ষ্য করে ফ্লেয়ার ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ শুরু করলে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই দাঙ্গার কারণে প্যারিসের বাস, ট্রেন ও সাধারণ রেলসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববারের এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৪১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু রাজধানী প্যারিস থেকেই আটক করা হয়েছে ২৮০ জনকে। প্যারিসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা নুনিয়াজ জানিয়েছেন, সমর্থকদের হামলায় অন্তত সাতজন পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে উগ্রবাদীদের এমন তাণ্ডবকে তিনি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং ফরাসি সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এই ঘটনা নিয়ে ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থি নেতা মারিন লে পেন এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, কেবল ফ্রান্সেই একটি ফুটবল ক্লাবের জয় এমন ভয়াবহ দাঙ্গার জন্ম দেয় এবং বিজয়ের রাতে সাধারণ মানুষকে ঘরে বন্দি থাকতে বাধ্য করে।
ফুটবলকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে এমন প্রাণঘাতী দাঙ্গা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৫ সালেও পিএসজির প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় উদযাপনের সময় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরসহ দুইজনের নির্মম মৃত্যু হয়েছিল। সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে এবারের ঘটনাটি ফরাসি ফুটবল ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর এক বড় দাগ ফেলে দিল। অথচ আজ বিকেলেই চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে আইফেল টাওয়ারের পাশে চম্প দে মার্স-এ এক জমকালো বিজয় শোভাযাত্রা এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দেওয়া রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। মাঠের ভেতরে লুইস এনরিকের দল সম্ভাব্য ১০টি ট্রফির মধ্যে ৮টি জিতে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ করলেও, মাঠের বাইরের এই সহিংসতা ক্লাবের গৌরবকে অনেকটাই ম্লান করে দিল।