প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র হজ পালন শেষে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অপার তৃপ্তি নিয়ে স্বদেশের মাটিতে ফিরতে শুরু করেছেন বাংলাদেশি হাজিরা। সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনার পবিত্রতা শেষে প্রিয়জনদের মাঝে ফিরে আসার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর থেকে হাজিদের দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম জোরেশোরে চলছে। এখন পর্যন্ত ৪৩টি ফিরতি ফ্লাইটের মাধ্যমে মোট ১৭ হাজার ৬৮৯ জন হাজি নিরাপদে দেশে অবতরণ করেছেন। পবিত্র কাবা শরিফের ছায়াতলে যে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি তারা অর্জন করেছেন, সেই পবিত্রতা ও আনন্দ নিয়েই তারা এখন মিলিত হচ্ছেন নিজেদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে।
প্রতি বছরের মতো এবারও হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ হাজিদের নির্বিঘ্ন যাতায়াতের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, নির্ধারিত তিনটি বিমান সংস্থা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই ফিরতি ফ্লাইট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। হাজিদের পরিবহনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এখন পর্যন্ত ১০টি ফ্লাইট সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এছাড়া সাউদিয়া এয়ারলাইনসের ১৫টি এবং ফ্লাইনাস এয়ারলাইনসের ১৮টি ফ্লাইটে করে হাজিরা দেশে ফিরেছেন। সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালনকারী হাজিদের মধ্যে এই ফিরতি যাত্রায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে ফিরেছেন ২ হাজার ৮২ জন এবং বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবস্থাপনায় ফিরেছেন ১৫ হাজার ৬০৭ জন।
তবে এই আনন্দের মাঝেও সৌদি আরবে কিছু হাজির চিরবিদায়ের সংবাদ গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ৪২ জন বাংলাদেশি হাজি মৃত্যুবরণ করেছেন। মহান রবের মেহমান হিসেবে পবিত্র ভূমিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা এই হাজিদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছেন দেশবাসী। হজ অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ২৭ জন পুরুষ এবং ১৫ জন নারী রয়েছেন। এই হাজিদের মধ্যে ৩২ জন পবিত্র নগরী মক্কায় এবং ১০ জন মদিনায় ইন্তেকাল করেছেন। প্রিয়জনের হজে যাওয়ার আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে শোকের রূপ নেওয়ার বিষয়টি স্বজনদের জন্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক, তবে পবিত্র ভূমিতে মৃত্যুকে অনেক হাজি পরম সৌভাগ্যের মনে করে থাকেন।
হজ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এ বছর ১৮ এপ্রিল প্রথম ফ্লাইটের মাধ্যমে হজ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল এবং তা ২১ মে শেষ হয়। সৌদি আরবের মরুভূমির উত্তাপ এবং হজের আনুষ্ঠানিকতার কঠিন শারীরিক পরিশ্রম পেরিয়ে হাজিরা এখন দেশে ফিরছেন। ফিরতি হজ ফ্লাইট গত ৩০ মে থেকে শুরু হয়েছে এবং এই কার্যক্রম চলবে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত। দীর্ঘ এক মাসের এই ফিরতি যাত্রায় যাতে কোনো হাজিকে কোনো প্রকার বিড়ম্বনার শিকার হতে না হয়, সে লক্ষ্যে হজ অফিস সার্বক্ষণিক তদারকি করছে। প্রতিটি ফ্লাইটে হাজিদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং ল্যাগেজ ব্যবস্থাপনার দিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
হাজিদের ঘরে ফেরার এই দৃশ্যটি অত্যন্ত আবেগঘন। বিমানবন্দরগুলোতে যখন হাজিরা নামছেন, তখন প্রিয়জনদের চোখের কোণে আনন্দাশ্রু দেখা দিচ্ছে। অনেকে দেশে ফেরার আগে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে কেনাকাটা ও দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। হজের কঠিন আনুষ্ঠানিকতা ও মক্কা-মদিনার স্মৃতি তাদের সারাজীবন আচ্ছন্ন করে রাখবে। হাজিদের এই ফেরা যেন এক নতুন জীবনের সূচনা। হজের পর তারা সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে যে পরিবর্তন নিয়ে ফিরেছেন, তা যেন তাদের আশেপাশের মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
হজ অফিস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হাজিদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ হাজিদের জন্য হুইলচেয়ার বা অসুস্থদের জন্য জরুরি মেডিকেল সাপোর্ট দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ফিরতি ফ্লাইটের সময়সূচী যেন ঠিকঠাক মেনে চলা হয়, সে ব্যাপারে এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে হাজিরা যেন কোনো প্রকার ক্লান্তি বা অসুস্থতা ছাড়াই পরিবারের কাছে পৌঁছাতে পারেন, সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হজ পালন শেষে পবিত্রতা বজায় রেখে তারা যে শান্তি নিয়ে ফিরছেন, তা যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
পরিশেষে বলা যায়, হজ ব্যবস্থাপনায় যে চ্যালেঞ্জ থাকে, তা কাটিয়ে হাজিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৪২ জন হাজির মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে শোকাহত করলেও, বাকিদের নিরাপদে দেশে ফিরে আসার প্রক্রিয়া যেন আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়, সেই প্রত্যাশা সবার। যারা ফিরছেন, তারা দেশের জন্য এবং নিজেদের পরিবারের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবেন। হজ শেষে হাজিদের এই ফিরে আসার মিছিল যেন এক মানবিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার গল্প হয়ে থাকে। তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ও হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে।