সর্বশেষ :

ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনল ভারত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ৩২ বার
ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনল ভারত

প্রকাশ: ০২ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের জন্য ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি জারি করা সংশোধিত ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স রুলস, ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশটির ভিসা সংক্রান্ত নিয়মাবলীতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা পর্যটক থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী ভিসাধারী—সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে অবস্থানের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের ফলে ভারতে অবস্থানরত বিদেশিদের এখন থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। নতুন এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে এবং ভারতে বসবাসরত প্রবাসীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

নতুন সংশোধিত নিয়মের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ১৮০ দিনের সময়সীমা সংক্রান্ত কড়াকড়ি। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১৮০ দিন বা তার কম মেয়াদে ভারতে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নিবন্ধন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বললে, আগে বিদেশিদের হাতে ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর অতিরিক্ত ১৪ দিন সময় থাকত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করার জন্য। কিন্তু নতুন প্রজ্ঞাপনে সেই বাড়তি ১৪ দিনের সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখন ১৮০ দিনের সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার আগেই ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিস বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় আইনি জটিলতা বা ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের মতো গুরুতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন তারা। ভারত সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতে বিদেশি নাগরিকদের গতিবিধির ওপর নজরদারি আরও জোরদার করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর কার্যকর ও স্বচ্ছ করে তোলা।

শুধু স্বল্পমেয়াদী ভিসাধারীরাই নন, বরং যাদের ভিসার মেয়াদ ১৮০ দিনের বেশি, তারাও এই নতুন কঠোর নিয়মের আওতাভুক্ত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদী ভিসাধারীরাও কোনো একক সফরে অথবা এক ক্যালেন্ডার বছরের মধ্যে ১৮০ দিনের বেশি একটানা ভারতে অবস্থান করেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের বিদেশিদের ক্ষেত্রেও এখন ১৮০ দিন সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নিবন্ধন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে। সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিশেষ জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া কাউকে ১৮০ দিনের বেশি অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হবে না। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী ভিসা নিয়ে ভারতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় থাকার বা ভিসা নবায়নের পুরোনো সুযোগগুলো অনেকখানি সীমিত হয়ে এসেছে। নিয়মিতভাবে ভারতে যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী, গবেষক এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের জন্য এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ছোট একটি ভুল বা সময়ের অবহেলায় তাদের ভিসার শর্ত ভঙ্গ হতে পারে।

নতুন নিয়মাবলীতে কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের নয়, বরং শিশু ও অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়েছে। আগে ভারতে কোনো বিদেশি নাগরিকের সন্তান জন্ম নিলে, বাবা-মাকে ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত অনলাইন পোর্টাল বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিষয়টি নিবন্ধন কর্মকর্তাকে জানাতে হতো। এটি ভিসা বা এক্সিট পারমিট পাওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। তবে সংশোধিত নিয়মে একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে যদি কোনো শিশুর বাবা বা মা উভয়ের মধ্যে অন্তত একজন ভারতীয় নাগরিক হন এবং তারা যদি সন্তানকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তাহলে জন্মের পর বাধ্যতামূলক রিপোর্টিংয়ের প্রয়োজন নেই। তবে এটিও শর্তসাপেক্ষ; যদি ওই শিশু ভবিষ্যতে ভারতে অবস্থানরত অবস্থায় অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে, তবে সে বিষয়টি ৩০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন কর্মকর্তাকে জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই সংশোধনীটি মিশ্র দম্পতিদের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করা যে কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না, তা সরকার পরিষ্কার করে দিয়েছে।

চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও ভারত সরকার প্রশাসনিক সংস্কার এনেছে। যেসব হাসপাতাল বা নার্সিং হোম চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি রোগীদের দীর্ঘ সময় থাকার ব্যবস্থা রাখে, তাদের জন্য প্রশাসনিক ও রিপোর্টিং প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল দায়িত্ব বা সেবার ধরনে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি, তবে বিদেশি রোগীদের তথ্য সংরক্ষণ এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রদানের প্রক্রিয়াটি এখন আরও বেশি হালনাগাদ ও ডিজিটাল করা হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে আসা বিদেশি রোগীদের ডাটাবেস সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং প্রতিটি পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত সরকারের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিগত বছরগুলোতে অবৈধভাবে অতিরিক্ত সময় অবস্থান এবং ভিসা শর্ত লঙ্ঘনের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সরকার এই ধরনের কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

নতুন এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে ভারতে অবস্থানরত সকল বিদেশি নাগরিককে এখন বাড়তি সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে ভিসার মেয়াদ এবং নিবন্ধন সংক্রান্ত তারিখগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখা এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং বাধ্যতামূলক। অনেক সময় অসচেতনতার কারণে বিদেশিরা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিবন্ধন করতে দেরি করে ফেলেন, যা তাদের জন্য বিপুল জরিমানা বা দেশে প্রত্যাবর্তনের মতো অপ্রীতিকর ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী সেই সুযোগ এখন প্রায় নেই বললেই চলে। তাই এখন থেকে ভারতে অবস্থানরত প্রতিটি বিদেশি নাগরিককে সময় থাকতেই তাদের ভিসার স্ট্যাটাস যাচাই করতে হবে এবং কোনো বিভ্রান্তি থাকলে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থানীয় ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়া, নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অধিকতর সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণ ভুল তথ্য প্রদান করলে নতুন নিয়মে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ভারত সরকারের এই নতুন ভিসা নীতি অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। একদিকে যেমন এটি প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে নাগরিকত্ব ও ভিসা নবায়নের বিষয়টি আরও সুশৃঙ্খল করেছে, অন্যদিকে এটি বিদেশি নাগরিকদের জন্য কঠোর কিছু শর্তও আরোপ করেছে। ভারতের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য কেবল বিদেশিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা নয়, বরং দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অভিবাসন খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা। যারা নিয়ম মেনে ভারতে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য এই সংশোধনীতে ভয়ের কিছু নেই, তবে প্রতিটি নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই এখন একমাত্র পথ। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আনে, এবং ভারত তার ব্যতিক্রম নয়। তাই যারা এখন ভারতে আছেন বা ভবিষ্যতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই নতুন নিয়মগুলো ভালোভাবে বুঝে নেওয়া সময়ের দাবি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিয়মগুলো মেনে চলাই হবে ভারতের মাটিতে নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে বসবাসের মূল চাবিকাঠি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত