বিশ্বকাপের আগে ফিফার বিরুদ্ধে প্লাতিনির মামলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
  • ১৮ বার
বিশ্বকাপের আগে ফিফার বিরুদ্ধে প্লাতিনির মামলা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে ঘিরে যখন কোটি কোটি সমর্থকের উচ্ছ্বাস তুঙ্গে, ঠিক সেই মুহূর্তেই নতুন এক আইনি বিতর্কের মুখে পড়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। আগামী ১১ জুন নতুন আঙ্গিকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের প্রাক্কালে ফিফা এবং এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা করেছেন উয়েফার সাবেক সভাপতি ও ফরাসি ফুটবল কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি। ফলে মাঠের উত্তেজনার পাশাপাশি প্রশাসনিক অঙ্গনেও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানটি।

তিন আয়োজক দেশ এবং ৪৮টি অংশগ্রহণকারী দল নিয়ে আয়োজিত হতে যাওয়া এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে প্রস্তুতি। ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বাড়ছে উত্তেজনা, দলগুলো শেষ মুহূর্তের কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত। কিন্তু এমন সময় ফিফার বিরুদ্ধে নতুন করে ওঠা অভিযোগ বিশ্বকাপের আবহে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

মিশেল প্লাতিনি একসময় ফিফার সভাপতি হওয়ার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার ছিলেন। ফ্রান্সের সাবেক এই অধিনায়কের অভিযোগ, সুপরিকল্পিত অভ্যন্তরীণ কারসাজির মাধ্যমে তাকে ফিফা সভাপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। তার দাবি, সেই ষড়যন্ত্রের পেছনে ফিফার তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা ছিল এবং এর ফলে বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্বে তার আসীন হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।

নতুন মামলায় প্লাতিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ছাড়াও ফিফার সাবেক আইন পরিচালক মার্কো ভিলিগার এবং সাবেক অডিট কমিটির চেয়ারম্যান ডোমেনিকো স্কালার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা অসৎ উদ্দেশ্যে আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছেন এবং পরিকল্পিতভাবে একটি মামলার মাধ্যমে তাকে ফুটবল প্রশাসন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করেছেন।

শুধু ফৌজদারি অভিযোগই নয়, প্লাতিনি পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন। তার মতে, সেই সময়কার ঘটনাগুলোর কারণে তিনি শুধু ব্যক্তিগত সম্মানহানির শিকার হননি, বরং বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পৌঁছানোর সুযোগও হারিয়েছেন।

এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটে ২০১৫ সালে। সে সময় প্রকাশ্যে আসে যে, ফিফার তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটার ২০১১ সালে মিশেল প্লাতিনিকে ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ অর্থ প্রদান করেছিলেন। এই অর্থপ্রদানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং পরবর্তীতে ফিফার নৈতিকতা কমিটি তদন্ত শুরু করে।

এর ফলস্বরূপ প্লাতিনি ও ব্লাটার দুজনই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন এবং ফুটবল প্রশাসন থেকে সাময়িকভাবে সরে যেতে বাধ্য হন। বিশেষ করে প্লাতিনির ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা তার দীর্ঘদিনের ফিফা সভাপতি হওয়ার স্বপ্নে বড় ধরনের আঘাত হানে। সেই সময় উয়েফার মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সামনে ২০১৬ সালে ফিফা সভাপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হওয়ার পথ অনেকটাই উন্মুক্ত হয়ে যায়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্লাতিনি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, পুরো আইনি প্রক্রিয়াটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার বিশ্বাস, তাকে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

অবশেষে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ফ্রান্সে প্লাতিনিকে ঘিরে চলমান মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। সুইস ফেডারেল ফৌজদারি আপিল আদালত তাকে এবং সাবেক ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারকে চূড়ান্তভাবে খালাস দেন। আদালতের রায়ে তাদের বিরুদ্ধে আনা জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সেই রায় চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

রায় ঘোষণার পর ৭০ বছর বয়সী প্লাতিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন যে তাকে ফিফা সভাপতি হওয়া থেকে ঠেকাতেই এই মামলা করা হয়েছিল। তবে বয়স ও সময়ের বাস্তবতায় তিনি আর ফুটবল প্রশাসনে সক্রিয়ভাবে ফিরতে চান না বলেও জানান।

তারপরও তিনি চান, পুরো ঘটনার পেছনের সত্য উদ্ঘাটিত হোক। নতুন অভিযোগে ফরাসি তদন্তকারীদের কাছে তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন, মূল ফৌজদারি তদন্ত চলাকালে ফিফা কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড এবং সুইস আইনজীবীদের সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য সমন্বয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে।

অন্যদিকে, ২০১৫ সালে ওঠা অভিযোগের পর ফিফা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। সংস্থাটির দাবি ছিল, তারা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করেছে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করা হয়নি। তবে প্লাতিনির নতুন মামলা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের ঠিক আগে এমন একটি মামলা ফিফার ভাবমূর্তির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। যদিও মাঠের ফুটবলে এর সরাসরি কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই, তবুও ফুটবল প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে এই ঘটনা।

বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বব্যাপী আনন্দ, আবেগ এবং ঐক্যের উৎসব। কিন্তু সেই উৎসবের প্রাক্কালে ফুটবলের প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে উত্থাপিত অভিযোগ মনে করিয়ে দিচ্ছে, মাঠের বাইরেও এই খেলাকে ঘিরে রয়েছে জটিল ক্ষমতার সমীকরণ এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্ন। এখন সবার নজর থাকবে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ফিফার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার দিকে।

এদিকে বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন চলছেই। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী অপেক্ষা করছেন প্রিয় দল ও তারকাদের পারফরম্যান্স দেখার জন্য। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরুর আগেই প্রশাসনিক অঙ্গনের এই আইনি লড়াই বিশ্ব ফুটবলের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত