আষাঢ় মাসের শুরু থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল জনজীবন। দিনের পর দিন আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা মিলছিল না। অবশেষে রাজধানীতে বৃষ্টি নামায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে নগরজীবনে। গরমে হাঁসফাঁস করা মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন, কমেছে তাপমাত্রাও।
বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই কালো মেঘ জমতে শুরু করে। এরপর দমকা হাওয়ার সঙ্গে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও বজ্রপাতও দেখা গেছে। বৃষ্টির কারণে ব্যস্ত সড়কগুলোতে যান চলাচল কিছুটা ধীর হয়ে গেলেও গরম থেকে মুক্তি পেয়ে অনেকেই আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীতে তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও ছিল উচ্চমাত্রায়। ফলে তাপমাত্রা খুব বেশি না থাকলেও অনুভূত গরম ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ, রিকশাচালক, পথচারী এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।
বৃষ্টির পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে আসে। সেই সঙ্গে বাতাসে শীতলতা অনুভূত হওয়ায় মানুষের স্বস্তি ফিরে আসে। অফিস শেষে অনেককেই বৃষ্টিভেজা পরিবেশ উপভোগ করতে দেখা যায়। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস।
মৌসুমিবিদরা বলছেন, আষাঢ় মাসে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক একটি বিষয় হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার ধরনে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কখনো দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে তীব্র গরম থাকে, আবার স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। ফলে আবহাওয়ার এই বৈচিত্র্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির কারণে কিছু জায়গায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকাগুলোতে সড়কের ওপর পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এতে কিছু সময়ের জন্য যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। তবে বৃষ্টির কারণে সৃষ্টি হওয়া এই সাময়িক দুর্ভোগের চেয়ে গরম থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন নগরবাসী।
একজন অফিসগামী বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে গরমে অফিসে যাওয়া-আসা খুব কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। আজকের বৃষ্টির পর অনেকটা স্বস্তি লাগছে। যদিও কিছু জায়গায় পানি জমেছে, তারপরও এই বৃষ্টি দরকার ছিল।”
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে এ ধরনের বৃষ্টি কৃষির জন্যও উপকারী। বিশেষ করে আমন ধান চাষ এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের জন্য বৃষ্টিপাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে অতিবৃষ্টি বা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা যেন না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, রাজধানীতে গাছপালা ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ার কারণে গরমের অনুভূতি আগের তুলনায় বেড়েছে। নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং জলাধার সংরক্ষণ করা গেলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গরম ও বৃষ্টির মধ্যবর্তী সময়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে সর্দি, জ্বর, ভাইরাল সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন পার্ক, খেলার মাঠ এবং উন্মুক্ত স্থানে মানুষের উপস্থিতি কিছুটা কমে গেলেও সন্ধ্যার পর আবহাওয়া মনোরম হয়ে ওঠে। অনেক পরিবারকে বাইরে সময় কাটাতে দেখা গেছে।
মৌসুমিবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। একই সঙ্গে নদীবন্দরগুলোকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আষাঢ়ের ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসীর জন্য এই বৃষ্টি স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। যদিও কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা ও যানজটের মতো সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছে, তবুও প্রকৃতির এই পরিবর্তন নগরজীবনে স্বস্তির আবহ তৈরি করেছে।