খামেনির জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে স্পিকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
খামেনির জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে স্পিকার

প্রকাশ: ০২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এবং আধুনিক ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ে অংশ নিতে তেহরানের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি ইরানের রাজধানী তেহরানের পথে যাত্রা করেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই প্রতিনিধি সফর মুসলিম বিশ্বের এই প্রখ্যাত নেতার প্রতি রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে খামেনির প্রয়াণ একটি বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে, যা পূরণ হওয়ার নয় বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

দীর্ঘ ৮৬ বছরের ঘটনাবহুল জীবনের ইতি টেনে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণকারী খামেনি তার কর্মময় জীবনে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের দক্ষতা তাকে বিশ্বমঞ্চে এক বিশেষ মর্যাদায় আসীন করেছিল। ১৯৮০ সালে তিনি অল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ইরান-ইরাক যুদ্ধের কঠিন সময়ে তিনি ইসলামী বিপ্লবী বাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। সেই সংকটকালীন মুহূর্তে তার অদম্য মনোবল এবং নেতৃত্ব ইরানের প্রতিটি মানুষের মধ্যে নতুন প্রেরণার সঞ্চার করেছিল।

রাজনৈতিক জীবনের সাফল্যের শিখরে পৌঁছে তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ১৯৮৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। সেই থেকে দীর্ঘ প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিবেশে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার মৃত্যু কেবল ইরান নয়, বরং সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার আদর্শ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দর্শন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং আগামী দিনগুলোতেও তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের এই সফর বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক প্রটোকল অনুযায়ী, কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ এবং শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ করা একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। স্পিকারের নেতৃত্বাধীন এই প্রতিনিধি দলটি ইরানের সরকার এবং জনগণের প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের গভীর শোক ও সমবেদনা পৌঁছে দেবেন। জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ৪ জুলাই স্পিকারের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তেহরানে পৌঁছে তিনি ইরানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করবেন এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের এই বিদায়ী নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকার প্রধানরা তেহরানে সমবেত হচ্ছেন। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এই মুহূর্তে স্পিকারের উপস্থিতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বকেও নতুন করে তুলে ধরছে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জীবন ছিল ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অনন্য সমাহার। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের টানাপোড়েনের সময়ে তিনি যে স্থির বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আধুনিক ইরানের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। আজ যখন তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হতে যাচ্ছেন, তখন বিশ্ববাসী তার সেই শান্ত কিন্তু বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরকে স্মরণ করছে।

একজন সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করা এবং জনগণের কাছাকাছি থাকার কারণে খামেনি তার দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। তার জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামার সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রমাণ করে তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। আমাদের স্পিকারের এই সফর ইরানের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সফরটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শোকের মুহূর্তে বন্ধুপ্রতিম দেশের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। স্পিকারের এই তেহরান সফর এবং সেখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

পরিশেষে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জীবন ও কর্ম নিয়ে সারা বিশ্বে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন বাংলাদেশের মতো একটি দেশ থেকে শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব তার প্রতি যথাযথ সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। একজন নেতার প্রয়াণ কীভাবে একটি জাতির পথচলাকে প্রভাবিত করতে পারে, তা খামেনির জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো। তার রেখে যাওয়া আদর্শ এবং ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে সেই দেশটিকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। আমরা আশা করি, স্পিকারের এই সফল সফর শেষে তিনি নিরাপদে দেশে ফিরবেন এবং তার অর্জিত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন ইতিবাচক ধারার সূচনা করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত