দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ, ধৃত ৯০০

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভ, ধৃত ৯০০

প্রকাশ: ০২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ আফ্রিকার আকাশ-বাতাস এখন অভিবাসীবিরোধী উত্তেজনার কালো মেঘে ঢাকা। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ যেন মঙ্গলবার এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দেশজুড়ে। বৈধ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের দেশত্যাগের দাবিতে ডাকা এক আন্দোলনের শেষ সময়সীমা পার হওয়ার সাথে সাথে দেশজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণের অভিযোগে পুলিশ এখন পর্যন্ত নয়শতেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। শান্তিপূর্ণ মিছিলের আড়ালে যেভাবে সহিংসতা, লুটপাট এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, তা দক্ষিণ আফ্রিকার সামাজিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে জোহানেসবার্গ ও ডারবানের মতো বড় শহরগুলোতে বিদেশি নাগরিকদের ওপর চালানো হামলা সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

মঙ্গলবার ভোরে যখন দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরের রাস্তায় মানুষ জড়ো হতে শুরু করে, তখন থেকেই উত্তেজনার আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। দেশটির পুলিশের তথ্যমতে, মোট ১২০টি স্থানে বিক্ষোভ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০৮টি এলাকায় জনজীবন স্বাভাবিক ছিল এবং বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ১২টি নির্দিষ্ট স্থানে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। হিলব্রো এবং আলেকজান্দ্রা টাউনশিপের মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে স্থানীয় বিক্ষোভকারীরা বিদেশি নাগরিকদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে তাণ্ডব চালায়। বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে পরিচিত স্পাজা দোকানগুলোতে চালানো লুটপাট এবং ভাঙচুর ছিল এক পরিকল্পিত অমানবিক কার্যক্রম। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা বাহিনী হিমশিম খায় এবং শেষ পর্যন্ত জোহানেসবার্গের কেন্দ্রস্থলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

আলেকজান্দ্রা টাউনশিপে গভীর রাতে চালানো গোলাগুলির ঘটনায় একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলেছে। এছাড়া হিলব্রোর ঘটনায় অন্তত দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই সহিংসতা কেবল সম্পদ ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি কেড়ে নিয়েছে সাধারণ মানুষের জান। বন্দরনগরী ডারবানের ঘটনাটি তো আরও বেশি হৃদয়বিদারক। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে এক বিদেশি নাগরিক একটি বহুতল ভবনের অষ্টম তলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণ হারান। এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান তীব্র ভয়ের প্রতিফলন। পুলিশের উপজাতীয় কমিশনার তেবেলো মোসিকিলি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন লঙ্ঘন থেকে শুরু করে ডাকাতি এবং জনসমক্ষে সহিংসতা সৃষ্টির মতো গুরুতর অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় গত কয়েক মাস ধরেই অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্বেষমূলক প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। বিশেষ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বাইরের দেশ থেকে আসা মানুষেরাই তাদের কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নিচ্ছে। এই বিদ্বেষ থেকেই গড়ে উঠেছে অভিবাসীবিরোধী সেই আন্দোলন, যারা দেশত্যাগের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পরপরই যেন একদল মানুষ আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দক্ষিণ আফ্রিকার ৯টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত পাঁচটি প্রদেশে বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে কোনো নতুন করে সংঘাত না ছড়ায়। কিন্তু এই পদক্ষেপ পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত করতে যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে স্থানীয় বিশ্লেষকদের মনে সংশয় রয়েই গেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে দেখছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারকে অবিলম্বে বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণে অভিবাসীবিরোধী এই জনস্রোতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বই মূলত সাধারণ মানুষকে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে। কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব এবং মূল্যস্ফীতির কবলে পড়া মানুষ যখন নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে, তখন তারা অনেক সময় আবেগতাড়িত হয়ে বিদেশি নাগরিকদেরই তাদের দুর্ভোগের কারণ হিসেবে দায়ী করে। তবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং আইন হাতে তুলে নেওয়াকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না, যা দক্ষিণ আফ্রিকার ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক মহলে ম্লান করে দিচ্ছে।

এই বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়, তার ওপর নির্ভর করছে দক্ষিণ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ সামাজিক অস্থিরতা। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং কারো বিরুদ্ধে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে শুধু গ্রেপ্তার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, অভিবাসন নিয়ে যে দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও সাংস্কৃতিক বিভেদ তৈরি হয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো একটি বৈচিত্র্যময় দেশে যেখানে বিভিন্ন জাতি ও ভাষার মানুষ যুগ যুগ ধরে একসাথে বাস করে এসেছে, সেখানে আজকের এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সত্যি এক বড় সতর্কবার্তা।

বিদেশি নাগরিকদের ওপর এই হামলা কেবল শারীরিক নির্যাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি তাদের মানসিক জগতের ওপরও গভীর ক্ষত তৈরি করছে। হাজার হাজার মানুষ যারা জীবনধারণের জন্য নিজেদের দেশ ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বেছে নিয়েছিল, তারা এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ফিরছে। দোকানপাট লুট হয়ে যাওয়ায় অনেকের সব সম্বল শেষ হয়ে গেছে। এই মানুষগুলোর সুরক্ষা প্রদান কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়, এটি নৈতিক দায়িত্ব। আশা করা হচ্ছে, দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার এই সংকটের নেপথ্যে থাকা মূল কারণগুলো খুঁজে বের করবে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সেদিকে কঠোর নজর দেবে। অন্যথায় আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির এই দেশটিতে গৃহবিবাদ ও অস্থিতিশীলতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত