প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি হলো নৌপথ। পণ্য পরিবহনের সহজলভ্য, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে দেশের অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের কাঁচামাল এবং উৎপাদিত পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য নদীপথের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক নৌপথে বিভিন্ন সেবার মাশুল ও শুল্ক হার ব্যাপক হারে বৃদ্ধির ঘোষণা শিল্প খাতে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এই একতরফা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সিমেন্ট, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন শিল্প ও সেবা খাতের পরিচালন ব্যয় ১০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতির এই কঠিন সময়ে খরচের এই বাড়তি বোঝা শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ ভোক্তা—উভয়কেই চরম বিপাকে ফেলবে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের আকাশচুম্বী দামের কারণে এমনিতেই চাপে রয়েছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে নৌপথে পণ্য পরিবহনের মাশুল বৃদ্ধি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বর্ধিত এই খরচের কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম সমন্বয় করতে হবে, যা একদিকে যেমন বিক্রি কমিয়ে দিতে পারে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অধিকাংশ ব্যবসায়ী সংগঠন অভিযোগ করেছে যে, কোনো প্রকার আলোচনা বা অংশীজনদের সঙ্গে যৌথ বৈঠক ছাড়াই বিআইডব্লিউটিএ সম্পূর্ণ একতরফাভাবে এই ফি পুনর্নির্ধারণ করেছে, যা ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
বিআইডব্লিউটিএ-এর নতুন প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, নৌপথের বিভিন্ন সেবার ফি কোথাও কোথাও ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ বা কনজারভেন্সি চার্জ হিসেবে আগে যেখানে দেশি কার্গো, বাল্কহেড বা বার্জের জন্য প্রতি টনে ৪০ থেকে ৫০ টাকা নেওয়া হতো, তা এখন বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে জ্বালানি তেল পরিবহনকারী নৌযান বা ট্যাংকারের ক্ষেত্রে ফি ১৪৪ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নৌপথের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলাচলের জন্য অপরিহার্য পাইলটেজ ফি ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৭৫ টাকা করা হয়েছে এবং মোংলা-ঘোষিয়াখালী বা গাবখান চ্যানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটের টোলও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রমিক বা কুলি চার্জের ক্ষেত্রেও অনুরূপ বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা সরাসরি পণ্য খালাস খরচের ওপর প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে দেশের সিমেন্টশিল্প। এই শিল্পটি তাদের প্রধান কাঁচামাল যেমন ক্লিংকার, লাইমস্টোন এবং ফ্লাই অ্যাশ আমদানির পর নদীপথেই কারখানায় নিয়ে আসে এবং উৎপাদিত সিমেন্টও নৌপথেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, নতুন এই নিয়মে প্রতিটি সিমেন্ট কোম্পানিকে আগের তুলনায় অন্তত ৭০ শতাংশ বাড়তি ফি পরিশোধ করতে হবে। সিমেন্ট উৎপাদনের উৎপাদনক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে তিন গুণ বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানো কোম্পানিগুলোর জন্য এক অসম্ভব লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সিমেন্ট খাতের মুনাফা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্মাণ খাতের ওপর এর প্রভাব কেবল উৎপাদকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সাধারণ ক্রেতা যারা গৃহনির্মাণ বা অবকাঠামোগত কাজে নিয়োজিত, তাদের ওপরও আর্থিক চাপ বাড়বে। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি ও লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল চৌধুরী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, নির্মাণ খাত বর্তমানে এক অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির ফলে সিমেন্টশিল্প আগে থেকেই অস্থির। এখন পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের পুরো কাঠামোই ভেঙে পড়ার উপক্রম হতে পারে।
বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স সমিতির সাবেক সহসভাপতি নাজমুল হোসাইন জানিয়েছেন যে, গত তিন বছরে লোহা ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে জাহাজ পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয় ইতিমধ্যে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এখন সরকারের আরোপিত নতুন মাশুল যোগ হলে মোট পরিচালনা ব্যয় আরও ১০ শতাংশ বাড়বে। এই ২৫ শতাংশ বাড়তি ব্যয় কোনোভাবেই ভাড়া বাড়িয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। আবার ভাড়া না বাড়ালে জাহাজ মালিকদের লোকসানের বোঝা টানতে হবে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২০১৯ সালের পর এই প্রথম এত বড় আকারে ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, অথচ এই দীর্ঘ সময়ে কোনো ধরণের অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা সেবার মানোন্নয়ন দৃশ্যমান হয়নি।
অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষের দাবি ভিন্ন। নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া জানিয়েছেন যে, আগের রেটগুলো অনেক পুরোনো ছিল এবং বর্তমান বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি যাচাই-বাছাই করেই এই নতুন রেট নির্ধারণ করেছে। তবে সরকারি এই অবস্থানের বিপরীতে ব্যবসায়ীরা বলছেন, হুট করে এত বেশি হারে মাশুল বৃদ্ধি শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আশার বাণীও শোনা গেছে। নৌপরিবহনসচিব জানিয়েছেন, বর্ধিত মাশুল নিয়ে ব্যবসায়ীদের যদি কোনো সুনির্দিষ্ট আপত্তি থাকে এবং তাঁরা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানান, তবে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে।
শিল্প খাতের এই সংকট মোকাবেলায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ-কে দ্রুত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি অর্থবহ আলোচনার টেবিলে বসা প্রয়োজন। কারণ, পরিবহন খরচ যখন শিল্পের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন তা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিকেই দুর্বল করে তোলে। সরকার একদিকে রাজস্ব সংগ্রহের দিকে নজর দিচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করার দায়ও তাদের ওপর বর্তায়। শিল্পের চাকা সচল রাখতে হলে মাশুলের যৌক্তিকীকরণ এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। আশা করা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের দাবির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে, যা শিল্প খাতকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবে এবং নৌপথের মাশুলকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসবে।