জ্বালানি সংকট: ভারত থেকে পেট্রল কিনছে রাশিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
জ্বালানি সংকট: ভারত থেকে পেট্রল কিনছে রাশিয়া

প্রকাশ: ০২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত রাশিয়া বর্তমানে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ডামাডোলে দেশটির তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি অবকাঠামো বারবার ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রলের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকট নিরসনে এতদিন যারা রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকত, এখন সেই রাষ্ট্রে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন পড়ছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, এই সংকট মোকাবেলায় রাশিয়া এখন বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতের দিকে হাত বাড়িয়েছে এবং ভারত থেকে সমুদ্রপথে পেট্রল আমদানি শুরু করেছে। ভূ-রাজনীতির এমন জটিল মোড় আগে কখনো দেখা যায়নি, যেখানে জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশটিকে নিজেদের চাহিদা মেটাতে অন্য দেশের পেট্রলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই আঘাত সরাসরি দেশটির পেট্রল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে রাশিয়ার ১১টি সময় অঞ্চলের বিশাল এলাকা জুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে পেট্রল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং কোথাও কোথাও জ্বালানি রেশন করে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পেট্রলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়ায় রাশিয়ার সাধারণ মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মস্কো অবশ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে দ্রুতই বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির পথ বেছে নিয়েছে।

শিল্প সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, ভারত থেকে এরই মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন পেট্রলবাহী ট্যাংকার রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এছাড়াও আরও কয়েকটি ট্যাংকার ৩০ থেকে ৪০ হাজার টন করে পেট্রল নিয়ে গন্তব্যের পথে রয়েছে। রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ভারত ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ বেলারুশ থেকে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহের ধারা অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে মাসে প্রায় ৪ লাখ টন পেট্রল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রীস্মকালে যখন রাশিয়ায় কৃষি কাজসহ অন্যান্য শিল্প খাতে জ্বালানির ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে, তখন প্রতিদিন অন্তত ১ লাখ ১০ হাজার টন পেট্রলের চাহিদা মেটানো সরকারের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ জয়ে ভারত থেকে আমদানি করা পেট্রল রাশিয়ার বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

এই সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত সপ্তাহে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেন যে, ড্রোন হামলার কারণে শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং সরকার তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়ার পার্লামেন্ট ইতোমধ্যেই কর আইনে জরুরি সংশোধনী এনেছে এবং জ্বালানি আমদানিতে বিশেষ ভর্তুকি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ভারতের কাছ থেকে যে পেট্রল কেনা হচ্ছে, তার মূল্যের ওপর ভিত্তি করেই এই ভর্তুকির অঙ্ক নির্ধারিত হবে। তবে ঠিক কোন ভারতীয় শোধনাগার থেকে এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ মুখ খোলেনি। ভারতের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে নীরবতা পালন করা হচ্ছে, যা সম্ভবত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে মাথায় রেখেই করা হয়েছে।

অন্যদিকে, রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্যের এই বিষয়টি আরও এক কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে যেমন ভারত থেকে পেট্রল নিচ্ছে রাশিয়া, ঠিক উল্টো দিকে জুন মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহের পথে হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা এড়াতে ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলো অধিক হারে রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল কিনছে। তথ্যানুযায়ী, ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকের বেশি এখন রাশিয়া থেকেই আসছে, যা গত মে মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। অর্থাৎ, যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক অস্থিরতায় এই দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে।

রাশিয়ার এই জ্বালানি সংকট কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যুদ্ধের প্রভাবে যেভাবে একটি তেলসমৃদ্ধ দেশ নিজস্ব চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তা প্রমাণ করে যে যুদ্ধ কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি দেশের অর্থনৈতিক মূলভিত্তিকেও ভেঙে দিতে সক্ষম। ভারত থেকে আমদানি করা এই জ্বালানি রাশিয়ার জন্য সাময়িক স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য তাদের শোধনাগারগুলোর মেরামত এবং উৎপাদন ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা জরুরি। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে রাশিয়ার এই ভারতমুখী হওয়া বিশ্ব রাজনীতির এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি বাণিজ্য কীভাবে দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত