ঝালমুড়ির প্রলোভনে শিশু ধর্ষণ: রাজবাড়ীতে গ্রেপ্তার ১

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
ঝালমুড়ির প্রলোভনে শিশু ধর্ষণ: রাজবাড়ীতে গ্রেপ্তার ১

প্রকাশ: ০২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিশু ও নারীদের ওপর যৌন নিপীড়ন এবং নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক মূল্যবোধের চরম পতনের এক ভয়ংকর চিত্র ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায়। রাজবাড়ী, নরসিংদী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সংঘটিত পৃথক তিনটি ধর্ষণের অভিযোগ আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের সমাজে শিশু এবং নারীরা কতটা অনিরাপদ। এর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে রাজবাড়ীর পাংশায়, যেখানে মাত্র সাত বছর বয়সী এক অবুঝ শিশুকে ঝালমুড়ি খাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত বয়স্ক এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে নরসিংদীতে প্রতিবন্ধী তরুণী ও কিশোরী এবং সরাইলে এক মাদ্রাসাছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, যা গোটা সমাজবিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি সমাজের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী, যার বয়স মাত্র সাত বছর, তাকে নিজের লালসার শিকার বানিয়েছে ৫৫ বছর বয়সী এক প্রৌঢ়। জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম লুৎফর বিশ্বাস। সে উপজেলার পাট্টা ইউনিয়নের জোনা পাট্টা গ্রামের মৃত আজাহার বিশ্বাসের ছেলে। লুৎফর পেশায় একজন ঝালমুড়ি বিক্রেতা এবং সে ভুক্তভোগী শিশুটির বাড়ির আশেপাশেই নিয়মিত ঝালমুড়ি বিক্রি করত। পাড়াপ্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে শিশুটির কাছে সে ছিল একজন পরিচিত মুখ। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে যে এক ভয়ংকর অপরাধী লুকিয়ে ছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি অবুঝ শিশুটি বা তার পরিবার।

গত মঙ্গলবার দুপুরে যখন চারপাশ কিছুটা নীরব ছিল, ঠিক সেই সুযোগটি কাজে লাগায় লুৎফর বিশ্বাস। সে শিশুটিকে ঝালমুড়ি খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে কৌশলে নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায়। শিশুটি সরল বিশ্বাসে তার সঙ্গে গেলে সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। দুপুরে শিশুটি যখন নিজ বাড়িতে ফিরে আসে, তখন তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দেখে তার মায়ের মনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়। প্রথমদিকে শিশুটি চরম আতঙ্ক ও ভয়ে কিছুই বলতে পারছিল না। কিন্তু মায়ের আদরে এবং অভয় পেয়ে সে ধীরে ধীরে ওই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা খুলে বলে। শিশুটির পেটে এবং বুকে নখের আঁচড় ও আঘাতের স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন ছিল, যা তার ওপর চলা পাশবিক নির্যাতনের নির্মম সাক্ষ্য বহন করছিল। বিকেলের দিকে শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করলে তাকে কালবিলম্ব না করে প্রথমে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা শিশুটির উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসার জন্য তাকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। বর্তমানে শিশুটি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রেখেছেন চিকিৎসকরা।

এই ঘটনার পর বুধবার শিশুটির মা বাদী হয়ে লুৎফর বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পাংশা মডেল থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরপরই পাংশা থানা পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করে এবং অভিযুক্ত লুৎফরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। পাংশা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মঈনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, মামলার একমাত্র আসামি লুৎফরকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির যেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হয়, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত তৎপর রয়েছে বলে তিনি আশ্বাস প্রদান করেন।

রাজবাড়ীর এই মর্মান্তিক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নরসিংদীর মাধবদী থেকে খবর এসেছে আরও দুটি পৈশাচিক ঘটনার। সেখানে এক বাকপ্রতিবন্ধী তরুণী এবং এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে আওলাদ হোসেন নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। ২৬ বছর বয়সী অভিযুক্ত আওলাদ সদর উপজেলার মাধবদী থানার বরদেরকান্দি গ্রামের মৃত মোশারফ হোসেনের ছেলে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ প্রশাসনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত সোমবার দুপুরে আওলাদ প্রথমে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। অপরাধীর নিষ্ঠুরতা এখানেই থেমে থাকেনি। সে অত্যন্ত সুকৌশলে ওই নির্যাতিত কিশোরীকে ব্যবহার করে গ্রামের আরেক ২২ বছর বয়সী বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীকে ডেকে আনে এবং তাকেও একইভাবে ধর্ষণের শিকার হতে বাধ্য করে।

যেহেতু বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীটি কথা বলতে অক্ষম, তাই সে তার ওপর বয়ে যাওয়া এই অমানবিক নির্যাতনের কথা সঙ্গে সঙ্গে কাউকে বোঝাতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তীতে ইশারায় ও নানাভাবে সে তার মাকে পুরো ঘটনাটি বুঝিয়ে বলতে সক্ষম হয়। এরপরই বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অভিযুক্ত আওলাদ হোসেন গত মঙ্গলবার থেকেই এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ইতোমধ্যে মাধবদী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে এবং পুলিশ পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য সম্ভাব্য সকল স্থানে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। সমাজের একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এবং সম্পূর্ণ অসহায় মেয়ের ওপর এমন নির্মম অত্যাচার মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা থেকে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে, যেখানে রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সেখানকার নূরে মদিনা হাফিজিয়া মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১০ বছর বয়সী এক নিরীহ ছাত্রকে বলাৎকারের মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে শিশুদের নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেওয়ার কথা, সেখানে এমন একটি ঘটনা চরম হতাশাজনক। গত ২২ জুন সরাইলের বিশ্বরোড কুট্টাপাড়া এলাকার ওই মাদ্রাসায় এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম আব্দুল হান্নান, যার বয়স ২৫ বছর। সে কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা গত ২৪ জুন তাকে দ্রুত কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরদিন ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা ন্যায়বিচারের আশায় অষ্টগ্রাম থানায় একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় এক অনাকাঙ্ক্ষিত আইনি জটিলতা। যেহেতু ঘটনাস্থল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানা এলাকার অন্তর্গত, তাই মামলাটি গ্রহণ ও তদন্তের এখতিয়ার নিয়ে দুই থানার মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন দেখা দেয়। তবে অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেন। তিনি জানিয়েছেন যে, তারা ইতিমধ্যে সরাইল থানাকে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠিয়েছেন এবং ভুক্তভোগীর পরিবারটিকে সরাইল থানায় গিয়ে মামলা পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন। পুলিশি এখতিয়ারের এই জটিলতা যেন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে উভয় থানারই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

সারাদেশ থেকে আসা এই তিনটি পৃথক নির্যাতনের ঘটনা আমাদের সমাজের এক গভীর ব্যাধির দিকেই ইঙ্গিত করছে। শিশু এবং প্রতিবন্ধী নারীরা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। তাদের ওপর এমন ধারাবাহিক পাশবিকতা প্রমাণ করে যে, সমাজে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইনের কঠোর প্রয়োগই নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, এমন পৈশাচিক ঘটনা রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার মাঝেই বেড়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত