এইচএসসি পরীক্ষা শুরু: নতুন অভিজ্ঞতায় ১২ লাখ পরীক্ষার্থী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
এইচএসসি পরীক্ষা শুরু: নতুন অভিজ্ঞতায় ১২ লাখ পরীক্ষার্থী

প্রকাশ: ০২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় সারা দেশে একযোগে শুরু হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। লাখো শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মাইলফলক স্পর্শ করার লড়াই আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। সকাল থেকেই দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে এক অন্যরকম আমেজ পরিলক্ষিত হয়েছে। অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল প্রতিটি কেন্দ্র। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই হাজার হাজার তরুণ-তরুণী তাদের উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপের টিকিট নিশ্চিত করার স্বপ্ন নিয়ে খাতা-কলম হাতে তুলে নিয়েছে। প্রথম দিনের পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, অন্যদিকে মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডের শিক্ষার্থীরাও তাদের নিজ নিজ বিষয়ের পরীক্ষায় বসেছে। জীবনের এই বড় ধাপে পদার্পণকারী প্রতিটি শিক্ষার্থীর চোখেমুখে ছিল যেমন সংশয়, তেমনি আগামীর সাফল্য অর্জনের দৃঢ় প্রত্যয়।

চলতি বছরে এইচএসসি, আলিম, এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), এইচএসসি (ভোকেশনাল) এবং ডিপ্লোমা-ইন-কমার্স পরীক্ষায় সর্বমোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা বোর্ড এবং কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দেশব্যাপী ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এই পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত কয়েক মাস ধরে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মেধা ও পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়নের জন্য প্রতিটি স্তরে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে এবং নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয় এবার অনন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা শিক্ষাক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

পরীক্ষার পবিত্রতা রক্ষায় এবার প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি মনিটরিং সেল স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো কেন্দ্রের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবহারে পরীক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতর কিংবা বাইরে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিনে এ ধরনের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, এই কঠোর নজরদারি মেধা বিকাশের সঠিক পথ প্রশস্ত করবে।

পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে। এটি সব বোর্ডের শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দেবে। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ এবং কেন্দ্রের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ডের কর্মকর্তারা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। প্রথম দিনের বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন কৌতূহল ছিল, তেমনি পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে তাদের স্বস্তির হাসি প্রমাণ করে যে, প্রস্তুতির পথে তারা আত্মবিশ্বাসী ছিল। সকাল থেকেই তীব্র গরম এবং যাতায়াত ব্যবস্থার প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কেন্দ্রে পৌঁছানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। তাদের এই কঠোর পরিশ্রমের পেছনে লুকিয়ে আছে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের অশেষ ত্যাগ।

পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগের রেশও লক্ষ্য করা গেছে। জীবনের পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণের জন্য এই এইচএসসি পরীক্ষার ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিনির্ভর বাজারে নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের এই শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানিয়েছে, গত কয়েক মাসের কঠোর পরিশ্রম এবং কোচিংয়ের বাইরেও নিজেদের অনুশীলনের কারণেই তারা আজ প্রশ্নের উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানের যে ধারা সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়েছে, তা তাদের প্রস্তুতিতে দারুণ সহায়তা করেছে।

শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল যে, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে প্রতিটি কেন্দ্র সচিবকে। শিক্ষাবিদদের মতে, একটি জাতির অগ্রগতির মূল ভিত্তি হলো তার শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা। এই এইচএসসি পরীক্ষা কেবল একটি সার্টিফিকেট পাওয়ার লড়াই নয়, বরং দেশের আগামীর কর্ণধার তৈরির এক বড় পরীক্ষা। পরীক্ষার্থীরা যেন কোনোভাবেই কোনো প্রকার অসদুপায়ের আশ্রয় না নেয়, সেজন্য প্রতিটি কেন্দ্রের সামনে এবং ভেতরে কঠোর সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়েছে।

আজকের এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাধ্যমে যে দীর্ঘ যাত্রার শুভসূচনা হলো, তার সমাপ্তি ঘটবে কয়েক সপ্তাহ পর। সারা দেশের অভিভাবক এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রত্যাশা, প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের দীর্ঘদিনের সাধনা ও প্রস্তুতির ফসল হিসেবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কোনো কেন্দ্র থেকে অনিয়মের সামান্যতম অভিযোগ পাওয়া গেলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মনিটরিং সেল সার্বক্ষণিক কাজ করায় পরীক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করা যাচ্ছে। আমরা আশা করছি, বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা কোনো বড় ধরনের বিতর্ক ছাড়াই সফলভাবে সম্পন্ন হবে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তরুণ এই প্রজন্মের মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের লক্ষ্যের পথে সফল হোক, এটাই আজকের দিনের একমাত্র প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত