ভূমিকম্প পরবর্তী স্বাস্থ্য সংকটে ভেনেজুয়েলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার
ভূমিকম্প পরবর্তী স্বাস্থ্য সংকটে ভেনেজুয়েলা

প্রকাশ: ০২ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভেনেজুয়েলা যেন এক মহাদুর্যোগের আবর্তে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ জুন আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্প দেশটির অস্তিত্বের সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া হাজারো মানুষের আর্তনাদ আর স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি এখন নতুন করে দানা বাঁধছে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে সংক্রমণের বিস্তার জনজীবনকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কমপক্ষে ২ হাজার ২৯৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়ে কাতরাচ্ছেন। কিন্তু মূল শঙ্কা এখন কেবল মৃত্যুসংখ্যার বাড়া-কমা নয়, বরং ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর ভেতর থেকে নতুন করে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা।

কারাকাসের সুপরিচিত হাসপাতাল ‘জোসে গ্রেগোরিও হার্নান্দেজ’-এর ট্রমা ইউনিটের প্রধান ডা. ইউজেনিও কোভা পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন এক আসন্ন ‘মহামারি বিপর্যয়’ হিসেবে। তার মতে, আমরা এতদিন কেবল ধ্বংসস্তূপ থেকে আহতদের উদ্ধার এবং তাদের আঘাতের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, কিন্তু এখন সময় এসেছে সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করার। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ভূমিকম্পে ধসে পড়া স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট এই বিপর্যয়কে দীর্ঘস্থায়ী করবে। যেসব রোগী ট্রমা বা আঘাতজনিত ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন, তারা এখন নতুন করে কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। স্যানিটেশন ব্যবস্থার এই ভেঙে পড়া দশা কেবল রোগীদের জন্যই নয়, বরং সুস্থ মানুষদের জন্যও মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লা গুয়াইরা অঞ্চলের একটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা তেরেসা বো যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। সেখানকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ডায়রিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাবকে উসকে দিচ্ছে। আশ্রয় নেওয়া মানুষজন বিশুদ্ধ পানি, পোর্টেবল টয়লেট এবং স্যানিটারি সামগ্রীর জন্য হাহাকার করছেন। অতিরিক্ত জনাকীর্ণ এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এখন রোগের আঁতুড়ঘরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে যেটুকু ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর কথা, তা প্রয়োজনের তুলনায় সমুদ্রের বালুকণার মতো সামান্য। এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিনাতিপাত করছে এবং যেকোনো মুহূর্তে সেখানে নতুন কোনো সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই সংকটের গভীরতা বুঝতে হলে ভেনেজুয়েলার বিগত দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ২০১৩ সাল থেকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে দেশটি যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জেরে ৭৭ লাখেরও বেশি মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মোট ৬০ হাজার নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ইতিমধ্যে দেশত্যাগ করেছেন। যারা থেকে গেছেন, তারা যথাযথ চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের অভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি সরবরাহের ৩০ শতাংশ এবং অপারেশন থিয়েটারগুলোতে ৭০ শতাংশেরও বেশি ঘাটতি রয়েছে, যা একটি উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ভেনেজুয়েলার চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য। সাউথকমের মুখপাত্র স্টিভেন ম্যাকলাউড জানিয়েছেন, প্রায় ৯০০ মার্কিন সেনা এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের ১০০ জন কর্মী উদ্ধারকার্যে সহায়তার জন্য পাঠানো হয়েছে। কারাকাস বিমানবন্দরের রানওয়ে মেরামত এবং উপকূলে নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েনসহ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ৩০ কোটি ডলারের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে ইউএনডিপি-এর স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার মোট বস্তুগত ক্ষতির পরিমাণ ৬৭০ কোটি ডলারেরও বেশি। এত বিশাল অংকের ক্ষতির বিপরীতে ৩০ কোটি ডলারের ত্রাণ সহায়তা কেবল সাময়িক মলম হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠন বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে এটি মোটেও পর্যাপ্ত নয়।

বর্তমান সংকট ভেনেজুয়েলার প্রতিটি পরিবারকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যারা ভূমিকম্পে বাড়িঘর হারিয়েছেন, তারা এখন খোলা আকাশের নিচে বা ঘিঞ্জি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছেন। খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, নেই ওষুধের সরবরাহ—এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকাটাই একটি বড় যুদ্ধ। সরকার এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর উচিত দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। নতুবা সংক্রমণের যে ঢেউ আসার পূর্বাভাস চিকিৎসকরা দিচ্ছেন, তা ভেনেজুয়েলার অবশিষ্ট স্বাস্থ্য কাঠামোর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে ওঠার আগেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই ভয়াবহ ধস দেশটিকে আরও বহু বছর পিছিয়ে দেবে।

বিশ্বের বিবেকবান মানুষের কাছে এখন প্রশ্ন উঠছে, ভেনেজুয়েলা কি এই গভীর অন্ধকার থেকে উত্তরণের কোনো পথ খুঁজে পাবে? দেশের ভেতরে থাকা সীমিত সম্পদ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে তারা যেভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এককভাবে এই বিপুল দুর্যোগ সামাল দেওয়া তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত কেবল আর্থিক সহায়তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলার এই নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দেওয়া। সময়টা এখন রাজনীতির নয়, বরং মানবতাকে বাঁচানোর। ভূমিকম্পে যা ভেঙে গেছে তা হয়তো কংক্রিট দিয়ে পুনর্নির্মাণ সম্ভব, কিন্তু সঠিক চিকিৎসার অভাবে যদি হাজারো মানুষ প্রাণ হারায়, তবে সেই দায়ভার পৃথিবী কোনোদিনও এড়াতে পারবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত