প্রকাশ: ৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের নয়নাভিরাম পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর এখন এক গভীর শোকে আচ্ছন্ন। বন্ধুদের সাথে আনন্দভ্রমণে এসে ধলাই নদীর জলে হারিয়ে যাওয়া সেই চিকিৎসক সুব্রত সাহা বিকাশের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাদাপাথরে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় ১৯ ঘণ্টা তল্লাশির পর শুক্রবার সকালে তার মরদেহ ভেসে ওঠে। ধলাই নদীর ৩ নম্বর পিলারের কাছে এক মাঝির নজরে আসা এই মরদেহ উদ্ধারের মাধ্যমে অবসান ঘটল এক শোকাতুর প্রতীক্ষার। এই মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গই করেনি, বরং পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা ও সাবধানতা নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে।
ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ২টার দিকে সুব্রত সাহা বিকাশ তার তিন বন্ধুকে নিয়ে ঢাকার কর্মব্যস্ত জীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে সিলেটে এসেছিলেন। সাদাপাথরের স্বচ্ছ পানির হাতছানি তাদের মোহিত করেছিল। জিরো পয়েন্ট এলাকায় ধলাই নদীর উৎস মুখে তারা যখন গোসলে নামেন, তখন হয়তো কল্পনাও করেননি যে এই আনন্দঘন মুহূর্তটিই জীবনের শেষ মুহূর্ত হয়ে উঠবে। হঠাৎ পানির তীব্র স্রোত ও গভীরতা তাদের ভারসাম্যের পরীক্ষা নিতে শুরু করে। বন্ধুদের আর্তনাদে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসলেও, স্রোতের তীব্রতায় চিকিৎসক বিকাশকে চোখের নিমিষেই হারিয়ে ফেলেন তারা। মুহূর্তের সেই শোকাতুর দৃশ্য প্রত্যক্ষদর্শীদের এখনো কাঁদাচ্ছে।
নিহত সুব্রত সাহা বিকাশ লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার মিহির লাল সাহার সন্তান। তার অকাল প্রয়াণে কেবল তার পরিবারই নয়, চিকিৎসা পেশার সাথে যুক্ত সতীর্থরাও গভীরভাবে শোকাহত। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ধলাই নদীতে মাছ ধরার সময় স্থানীয় মাঝি রুবেল মিয়া মরদেহটি ভাসতে দেখেন। স্থানীয় জেলেদের সহযোগিতায় মরদেহটি উদ্ধার করে তীরে আনা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিখোঁজের পর থেকেই প্রশাসন ও স্থানীয়রা উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছিল। শুক্রবার সকালে মরদেহ পাওয়ার পর পরবর্তী আইনানুগ সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর সাদাপাথর এলাকাটি যেন এক নিস্তব্ধ জনপদে পরিণত হয়েছে। পর্যটন মৌসুমে এই এলাকায় পর্যটকদের ভিড় বাড়লেও, অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত সাবধানতা অবলম্বন না করার মাশুল দিতে হয় জীবন দিয়ে। সাদাপাথরের পানি দেখতে শান্ত মনে হলেও এর তলদেশ বেশ অসমতল এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে এখানে স্রোত যেকোনো সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
সুব্রত সাহার এই বিদায় যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির রূপসুধা উপভোগ করার পাশাপাশি জীবন রক্ষার প্রাথমিক শর্তগুলো কতটা অপরিহার্য। বন্ধুদের সাথে আনন্দ করতে এসে এমন পরিণতি কেউ আশা করেননি। চিকিৎসকের মতো একটি মহান পেশায় নিয়োজিত থাকা বিকাশের মৃত্যুতে তার প্রিয়জনরা এখন সান্ত্বনার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। তার সহকর্মীরা জানান, বিকাশ ছিলেন একজন অত্যন্ত মেধাবী ও প্রাণচঞ্চল মানুষ। তার অসময়ে চলে যাওয়া চিকিৎসা খাতেও এক বড় শূন্যতা সৃষ্টি করল। শুক্রবার সকালে যখন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পর্যটকদের বারবার সতর্ক করার পরেও অনেক ক্ষেত্রে তা উপেক্ষা করা হয়। সাদাপাথর এলাকায় গোসলে নামার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা এবং স্থানীয় গাইডের পরামর্শ মেনে চলার যে আহ্বান রয়েছে, তা অনেক সময় পর্যটকরা গুরুত্ব দেন না। এই দুর্ঘটনাটি পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধি এবং পর্যটকদের জন্য আরও কঠোর নির্দেশিকা জারির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। পর্যটন এলাকাগুলোতে প্রাণহানির ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে লক্ষ্যে প্রশাসনের পাশাপাশি পর্যটকদেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সুব্রত সাহা বিকাশের মতো একজন সম্ভাবনাময় চিকিৎসকের মৃত্যুতে কেবল তার পরিবারই নয়, পুরো দেশ একজন সেবককে হারাল। তার অকাল প্রস্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের অনিশ্চয়তা। সিলেটের এই পর্যটনস্পটটি যেন আর কারো জীবনের শেষ গন্তব্য না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। তার আত্মার শান্তি কামনা করে স্বজনরা এখন কেবল প্রহর গুনছেন ময়নাতদন্ত শেষে বাড়ি ফেরার। একটি সুখী পরিবারের সকল আলো নিভিয়ে বিকাশের এই বিদায় আমাদের সবার মনে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দিয়ে গেল। পর্যটনের আনন্দ যেন আর কখনোই বিষাদে রূপ না নেয়, এই কামনাই এখন সবার।