সর্বশেষ :
প্রথম বছরেই চমক: ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানার বিপুল মুনাফা শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো: বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার সতর্কতা ব্যারিস্টার ফুয়াদকে নিয়ে দুদুর বিস্ফোরক ভাষ্য ডায়াবেটিস নেই তবুও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি? যুক্তরাজ্যে মিলল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বিরল কপি পেঁয়াজ উৎপাদনে রেকর্ড, তবুও কেন আমদানির চাপে কৃষক? সিলেটের সাদাপাথরে নিখোঁজ চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার ৮৮ বছর পর নকআউটে জয়: ইতিহাস গড়ল সুইজারল্যান্ড ইন্দোনেশিয়ায় মার্কিন পাইলটকে গুলি করে হত্যা, পুড়িয়ে দেওয়া হলো বিমান অফিস টাইমে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা: সাংবাদিক দেখেই দৌড় চিকিৎসকের

পেঁয়াজ উৎপাদনে রেকর্ড, তবুও কেন আমদানির চাপে কৃষক?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
পেঁয়াজ উৎপাদনে রেকর্ড, তবুও কেন আমদানির চাপে কৃষক?

প্রকাশ:  ০৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের কৃষিখাতে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন এ দেশের কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এক ফালি জমি ফেলে না রেখে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে কৃষকরা যে পরিমাণ পেঁয়াজ ফলিয়েছেন, তা দেশের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বড্ড নির্মম। সোনালি ফসলের বাম্পার ফলন ঘরে তোলার পর কৃষকের মুখে হাসি ফোটার বদলে নেমে এসেছে চরম হতাশা ও দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে বিক্রয়মূল্য এতোটাই কম যে, দিশেহারা অনেক কৃষককে চোখের জলে নিজের উৎপাদিত ফসল খাল-বিল বা ডোবায় ফেলে দিতে দেখা গেছে। এই विरोধাভাসপূর্ণ পরিস্থিতি কেবল কৃষককেই সর্বশান্ত করছে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপরও বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুরের সালথা থেকে শুরু করে পাবনা, রাজবাড়ী ও মেহেরপুরের বিভিন্ন এলাকায় এখন কান্নার রোল। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র আটশ থেকে নয়শ টাকায়, কোনো কোনো স্থানে তা সাতশ টাকার নিচে নেমে এসেছে। অথচ একজন কৃষককে এক মণ পেঁয়াজ ফলাতে বীজ, সার, সেচ ও শ্রম বাবদ খরচ করতে হয়েছে অন্তত পনেরো শ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রিতে কৃষককে লোকসান গুণতে হচ্ছে সাত থেকে আটশ টাকা। বছরের দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমের ফল যখন এভাবে ধুলোয় মিশে যায়, তখন সেই কৃষকের মনে আর নতুন করে চাষাবাদের উৎসাহ অবশিষ্ট থাকে না। তবুও অভাবের তাড়নায় তারা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মাঠে নামেন, আর প্রতি মৌসুমে সেই ঋণের অংক শুধু বাড়তেই থাকে।

রেকর্ড উৎপাদনের পরেও এই আমদানির চক্র কেন পিছু ছাড়ছে না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থার চরম অভাব। বাংলাদেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি বিশাল অংশ হলো ‘মুড়িকাটা’ বা আগাম জাতের, যা খুব দ্রুত পচে যায় এবং বেশিক্ষণ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, মূল মৌসুমের ‘হালি’ পেঁয়াজ ধরে রাখার জন্য যে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কোল্ড স্টোরেজ বা উন্নত হিমাগার প্রয়োজন, তার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। কৃষকরা আজও তাদের পেঁয়াজ বাঁশের মাচায় বা সাধারণ ঘরের মেঝেতে সংরক্ষণ করেন। দেশের চরম ভ্যাপসা গরম ও আর্দ্রতার কারণে প্রতি বছর গড়ে পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। কাগজে-কলমে যে উদ্বৃত্ত উৎপাদন দেখা যায়, গুদামজাত করার অভাবে তার একটি বড় অংশ বাস্তবে মানুষের পাতে পৌঁছানোর আগেই আবর্জনায় পরিণত হয়।

এই পচনশীলতাকে পুঁজি করেই গড়ে উঠেছে অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের এক শক্তিশালী চক্র। ফসলের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই মাঠ পর্যায় থেকে সস্তায় পেঁয়াজ কিনে তারা আড়তে মজুত করে। সরকারের নজরদারির অভাব ও কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে তারা যখন বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়, তখন বাধ্য হয়ে সরকারকে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিতে হয়। ফলে একদিকে স্থানীয় কৃষক পান না ফসলের ন্যায্য দাম, অন্যদিকে আমদানিকৃত উচ্চমূল্যের পেঁয়াজ কিনে সাধারণ ক্রেতার পকেট খালি হতে থাকে। এই দুষ্টুচক্রটি ভাঙতে না পারলে কেবল উৎপাদন বাড়িয়ে পেঁয়াজের বাজারে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়, কারণ মুদ্রার উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে সুপরিকল্পিত বাজার কারসাজি।

তবে এই সংকটের অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখার চেষ্টাও করছে সরকার। কৃষি গবেষকরা ‘বারি পেঁয়াজ-৫’সহ উচ্চ ফলনশীল ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় চাষ উপযোগী জাত উদ্ভাবন করেছেন, যা বর্ষা ও গরমেও ভালো ফলন দেয়। সরকার উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই জাতের চাষাবাদ দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহের মতো প্রণোদনা দিচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন যে, কৃষক পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এয়ার-ফ্লো মেশিন স্থাপনের মাধ্যমে বাতাসপ্রবাহ পদ্ধতিতে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণের একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষকরা তাদের পণ্য ধরে রেখে বাজারের অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে পারবেন এবং সিন্ডিকেটের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মনিটরিং বিভাগের উপপরিচালক ড. মো. আবু জাফর আল মনসুর বলেন, দেশীয় কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। রেকর্ড ফলনের মৌসুমে আমদানি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তারা মন্ত্রণালয়ে জোর সুপারিশ করেছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কামরুল হাসানও আশাবাদী কণ্ঠে জানিয়েছেন, সরকার পেঁয়াজ আমদানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার মাধ্যমে পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি যদি সঠিক বিপণন ও উন্নত সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, তবেই কেবল এই আমদানিনির্ভরতা থেকে উত্তরণ সম্ভব।

পরিশেষে বলা যায়, পেঁয়াজ আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। এই পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ কেবল আমদানির ওপর ছেড়ে দেওয়াটা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। কৃষকের ঘাম আর শ্রমে ফলানো ফসলের উপযুক্ত দাম পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। যদি কৃষক তার পণ্যের সঠিক মূল্য পান, তবেই তিনি বারবার কৃষিকাজে উৎসাহিত হবেন এবং দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। এখন সময় এসেছে মাঠ পর্যায়ের কৃষক, কৃষি গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের একযোগে কাজ করার। আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী বাজার মনিটরিং ব্যবস্থার সমন্বয়েই কেবল পেঁয়াজের এই আমদানির গ্লানি থেকে মুক্ত হতে পারে বাংলাদেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত