প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের কৃষিপ্রধান অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো সার কারখানাগুলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নরসিংদীর পলাশ উপজেলার শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নির্মিত দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি’ তার লক্ষ্য অর্জনে এক অবিশ্বাস্য সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের সুবিধা কাজে লাগিয়ে উৎপাদন শুরুর প্রথম বছরেই কারখানাটি প্রায় ২৩৩ কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জন করেছে। সরকারি মালিকানাধীন পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দিয়ে কারখানাটি প্রমাণ করেছে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকেও অভাবনীয় সাফল্য পাওয়া সম্ভব।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ঘটা করে কারখানাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও পুরোদমে উৎপাদন শুরু হতে প্রায় আট মাস সময় লেগেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে ধুঁকতে থাকা দেশের সার শিল্পে এই সাফল্য এক নতুন আশার আলো ছড়িয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কারখানাটির এই সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির পূর্ণ ব্যবহার। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার সফলতার শিখরে অবস্থান করছে, সেখানে বাকি চারটি সরকারি ইউরিয়া সার কারখানা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪১৪ কোটি টাকার লোকসান গুনেছে। ফলে এই সাফল্যের ওজন দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতে বহুগুণ বেড়ে গেছে।
প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত এই কারখানাটি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদনকারী কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দৈনিক দুই হাজার আটশ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক নয় লাখ চব্বিশ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এই কারখানাটি কৃষি উন্নয়নের পথে এক বিশাল চালিকাশক্তি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির মোট রাজস্ব আয় ছিল দুই হাজার ছয়শ বত্রিশ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে দেশের কৃষকের চাহিদা মেটাতে সার বিক্রি থেকে এসেছে এক হাজার সাতশ তেত্রিশ কোটি টাকা এবং সরকার প্রদত্ত ভর্তুকি থেকে এসেছে প্রায় আটশ নিরানব্বই কোটি টাকা।
এই সাফল্যের নেপথ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ খান জানিয়েছেন যে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত থাকায় তারা তাদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯০ শতাংশ অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। যদিও গ্যাস সংকটের কারণে বছরজুড়ে অন্তত চল্লিশ দিন কারখানাটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল, তবুও পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনার সুযোগ থাকায় প্রথম বছরেই মুনাফা ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। কারখানাটির মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে নয়শ এক কোটি টাকা। সেখান থেকে পরিচালন ব্যয় ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের পর ২৩২ কোটি ৬৯ লাখ টাকার নিট মুনাফা অর্জিত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য, কারণ কারখানাটি বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।
কারখানাটি নির্মাণের জন্য নেওয়া দীর্ঘমেয়াদী ঋণের পরিমাণ প্রায় বারো হাজার আশি কোটি টাকা, যার বড় অংশই জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ গ্যারান্টি সংস্থা (এমআইজিএ) থেকে নেওয়া। অর্থবছরে এই ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারখানাটি প্রায় এক হাজার দুইশ ছিয়াশি কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। নিজস্ব আয় থেকে এত বিপুল পরিমাণ দায় পরিশোধ করার পরেও মুনাফা অর্জন করা প্রমাণ করে যে, যথাযথ কারিগরি সহায়তা পেলে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বনির্ভর হতে সক্ষম। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আশাবাদী যে, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋণের বোঝা অনেকটাই হালকা হয়ে আসবে।
অন্যদিকে, সরকারি মালিকানাধীন অন্য কারখানাগুলোর চিত্র মোটেও সুখকর নয়। আশুগঞ্জ, শাহজালাল, চিটাগাং ও যমুনা ফার্টিলাইজার—এই চারটি কারখানা মিলে চারশ চোদ্দ কোটি টাকার লোকসান করেছে। প্রধানত প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাব এবং পুরোনো প্রযুক্তির কারণে এই কারখানাগুলো তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এটি স্পষ্ট যে, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বিঘ্নিত হলে সরকারি কারখানাগুলো লোকসানের চক্রে আটকা পড়ে যায়। যেখানে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার গ্যাস সুবিধা পেয়ে মুনাফা করছে, সেখানে অন্য কারখানাগুলোতে সেই সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে সামগ্রিক সার শিল্পে স্বনির্ভরতা অর্জন করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরিয়া সারের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশীয় চাহিদা মেটাতে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার জন্য খরচ হয় বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা। ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানার মতো যদি প্রতিটি কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখা সম্ভব হয়, তবে আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেক কমে আসবে। এটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় করবে, তেমনি দেশের কৃষকের দোরগোড়ায় সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করবে।
পরিশেষে বলা যায়, ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজারের এই সাফল্য কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের জয় নয়, বরং এটি দেশের শিল্প ব্যবস্থাপনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করলে সরকারি খাতের যেকোনো প্রকল্প যে সফল হতে পারে, তা আজ প্রমাণিত। এখন প্রয়োজন অন্য কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন এবং গ্যাস সরবরাহে সমতা নিশ্চিত করা। যদি আগামী দিনগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সার উৎপাদনে কেবল স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না, বরং উদ্বৃত্ত সার রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। কৃষি ও শিল্প খাতের এই মেলবন্ধনই হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আসল শক্তি।