সর্বশেষ :
ব্যারিস্টার ফুয়াদকে নিয়ে দুদুর বিস্ফোরক ভাষ্য ডায়াবেটিস নেই তবুও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি? যুক্তরাজ্যে মিলল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বিরল কপি পেঁয়াজ উৎপাদনে রেকর্ড, তবুও কেন আমদানির চাপে কৃষক? সিলেটের সাদাপাথরে নিখোঁজ চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার ৮৮ বছর পর নকআউটে জয়: ইতিহাস গড়ল সুইজারল্যান্ড ইন্দোনেশিয়ায় মার্কিন পাইলটকে গুলি করে হত্যা, পুড়িয়ে দেওয়া হলো বিমান অফিস টাইমে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা: সাংবাদিক দেখেই দৌড় চিকিৎসকের বিশ্বমঞ্চে চুয়েট শিক্ষার্থীদের সাফল্য: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল ৪০ কোটি টাকায় ডমিনেজ স্টিল কিনছে আকিজ রিসোর্সেস

অফিস টাইমে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা: সাংবাদিক দেখেই দৌড় চিকিৎসকের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
অফিস টাইমে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা: সাংবাদিক দেখেই দৌড় চিকিৎসকের

প্রকাশ: ৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের চিকিৎসাসেবা খাতে এক নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক ঘটনার অবতারণা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সরকারি সেবার প্রতি আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (কো-অর্ডিনেটর) ডা. মো. ইনজামাম উল হককে সরকারি কর্মঘণ্টায় অফিসে থাকার পরিবর্তে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী দেখতে দেখা গেছে। সবচেয়ে নাটকীয় ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন সাংবাদিকরা তাকে সেখানে উপস্থিত দেখে ক্যামেরাবন্দি করতে শুরু করেন। ক্যামেরা দেখে কোনো প্রকার কৈফিয়ত বা পেশাদারিত্বের পরিচয় না দিয়ে ওই চিকিৎসক ঝড়ের গতিতে হাসপাতাল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যান। এই অদ্ভুত ঘটনার ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের আরামবাগ এলাকার ‘চাঁপাই এ্যাপোলো হাসপাতালে’। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিভিল সার্জন কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও ডা. ইনজামাম উল হক তখন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে মগ্ন ছিলেন। ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে একজন রোগীর আলট্রাসনোগ্রাম করছিলেন। সাংবাদিকরা যখন তাকে প্রশ্ন করার জন্য হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি ক্যামেরার লেন্স দেখামাত্রই হতভম্ব হয়ে পড়েন। কোনো কিছু ভেবে ওঠার আগেই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দৌড় শুরু করেন এবং হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে দ্রুত সটকে পড়েন। এই দৃশ্যটি যারা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের কাছে সরকারি একজন চিকিৎসকের এমন পলায়নপর আচরণ অত্যন্ত আপত্তিকর মনে হয়েছে।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় বইছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জনগণের করের টাকায় সরকারি দপ্তরে নিয়োগ পাওয়া একজন চিকিৎসক কীভাবে অফিস ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, তা বোধগম্য নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমিনুল ইসলাম নামক এক সচেতন নাগরিক লিখেছেন, সরকারি দায়িত্ব অবহেলা করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল নৈতিক স্খলনই নয়, বরং সরকারি সেবার প্রতি চরম অবজ্ঞা। তিনি এই চিকিৎসকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যেন ভবিষ্যতে অন্য কেউ সরকারি দায়িত্ব পালনে এমন উদাসীনতা দেখানোর সাহস না পায়।

এদিকে অভিযুক্ত চিকিৎসকের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে অদ্ভুত সব যুক্তি তুলে ধরেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চাঁপাই এ্যাপোলো হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন এবং তত্ত্বাবধায়ক শ্রী বিশ্বজিৎ দাবি করেছেন, ডা. ইনজামাম উল হক দুপুরের বিরতিতে সেখানে গিয়েছিলেন। শ্রী বিশ্বজিৎ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন যে, একটি সিন্ডিকেট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং এটি একটি ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে সরকারি অফিস টাইমে ‘বিরতি’র নামে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে বাণিজ্যিকভাবে রোগী দেখার আইনগত কোনো সুযোগ নেই, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। এই ঘটনায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও ডা. ইনজামাম উল হক ফোন রিসিভ করেননি কিংবা কোনো মন্তব্য প্রদান করেননি। পরে তার ফেসবুক আইডি থেকে জানানো হয় যে, বিষয়টি সমাধান হয়েছে এবং নেতিবাচক মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানানো হয়।

ঘটনাটি নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দিন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ডা. ইনজামাম উল হক সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দাপ্তরিক কাজে অফিসে ছিলেন, কিন্তু অফিস চলাকালীন সময়ে প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি বলেন, অফিস চলাকালীন সময়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার কোনো অবকাশ নেই এবং এটি সরাসরি নিয়মবহির্ভূত। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বা প্রমাণিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সিভিল সার্জনের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, পুরো বিষয়টি এখন দাপ্তরিক তদন্তের আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকারি চিকিৎসকদের নিয়মিত অফিস করার পরিবর্তে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বেশি সময় দেওয়ার প্রবণতা দেশের চিকিৎসাসেবা খাতের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এটি কেবল সেবাগ্রহীতাদেরই ভোগান্তিতে ফেলে না, বরং চিকিৎসকদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করে। ডা. ইনজামাম উল হকের দৌড়ে পালানোর ঘটনাটি আমাদের দেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এক বড় দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। পেশাদারিত্বের অভাব এবং জবাবদিহিতার অভাবে যখন কোনো চিকিৎসক নিজের দাপ্তরিক দায়িত্ব ভুলে ব্যক্তিগত মুনাফার পেছনে ছোটেন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। এই ঘটনাটি একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য, বিশেষ করে যারা স্বাস্থ্যসেবার মতো মহান পেশায় নিয়োজিত।

পরিশেষে বলা যায়, ডা. ইনজামাম উল হকের দৌড়ে পালানোর ভিডিওটি কেবল একটি হাস্যকর ঘটনা নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার এক করুণ চিত্র। একজন সরকারি মেডিকেল অফিসারের কাছ থেকে যে ধরনের মর্যাদা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত ছিল, তা এখানে অনুপস্থিত। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যদি তার দোষ প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু দায়সারা তদন্ত নয়, বরং সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুফল যাতে প্রান্তিক মানুষ পায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণই পারে ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে সরকারি দপ্তরের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত