সর্বশেষ :
প্রথম বছরেই চমক: ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানার বিপুল মুনাফা শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো: বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার সতর্কতা ব্যারিস্টার ফুয়াদকে নিয়ে দুদুর বিস্ফোরক ভাষ্য ডায়াবেটিস নেই তবুও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি? যুক্তরাজ্যে মিলল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বিরল কপি পেঁয়াজ উৎপাদনে রেকর্ড, তবুও কেন আমদানির চাপে কৃষক? সিলেটের সাদাপাথরে নিখোঁজ চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার ৮৮ বছর পর নকআউটে জয়: ইতিহাস গড়ল সুইজারল্যান্ড ইন্দোনেশিয়ায় মার্কিন পাইলটকে গুলি করে হত্যা, পুড়িয়ে দেওয়া হলো বিমান অফিস টাইমে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা: সাংবাদিক দেখেই দৌড় চিকিৎসকের

যুক্তরাজ্যে মিলল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বিরল কপি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
যুক্তরাজ্যে মিলল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বিরল কপি

প্রকাশ: ০৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইতিহাসের ধুলোবালি সরিয়ে মাঝে মাঝে এমন কিছু নিদর্শন বেরিয়ে আসে, যা বর্তমানকে অতীতের সঙ্গে এক অমোঘ সেতুবন্ধনে আবদ্ধ করে। তেমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাজ্যের জাতীয় আর্কাইভে। গত বছরের মে মাসে আর্কাইভের এক স্বেচ্ছাসেবক অত্যন্ত সাধারণ একটি নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের একটি অত্যন্ত দুর্লভ ও ঐতিহাসিক কপি। ১৭৭৬ সালে ছাপানো এই দলিলটি এখন বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রাক্কালে এই আবিষ্কার কেবল ঐতিহাসিকদের জন্যই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে।

এই ঐতিহাসিক দলিলটি খুঁজে বের করেছেন মাইকেল স্কার নামের এক অবসরপ্রাপ্ত বীমা কর্মকর্তা। গত এগারো বছর ধরে তিনি যুক্তরাজ্যের জাতীয় আর্কাইভে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে আসছেন। প্রতি বৃহস্পতিবারের অভ্যাসবশত তিনি পুরনো নথিপত্র পরীক্ষা ও তালিকাভুক্ত করছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে গবেষকদের কাজ সহজতর হয়। সেই দিন তিনি অষ্টাদশ শতকের রয়্যাল নৌবাহিনীর এক ক্যাপ্টেনের চিঠিপত্র পর্যালোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। চিঠিপত্র গোছাতে গিয়ে ১৭৭৬ সালের বড়দিনের প্রাক্কালে আমেরিকার ‘ডালটন’ নামক একটি প্রাইভেটিয়ার জাহাজ আটকের ঘটনার একটি প্রতিবেদনের সঙ্গে ভাঁজ করা একটি কাগজ তার নজরে আসে। কাগজের ওপর অস্পষ্টভাবে কেবল লেখা ছিল ‘আরেকটি কাগজ’। কিন্তু ভাঁজ করা সেই কাগজটি সাবধানে খোলার পর যা বেরিয়ে এল, তা ছিল অপ্রত্যাশিত। কাগজের শীর্ষে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘ডিক্লারেশন’। সাথে সাথে মাইকেল স্কার বুঝতে পারেন, এটি কোনো সাধারণ কাগজ নয়, বরং ইতিহাসের এক অমূল্য রত্ন—যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।

পরবর্তীতে গবেষকদের নিবিড় পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণার বিরল ‘এক্সেটার মুদ্রণ’ সংস্করণের একটি আসল কপি। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই মূল ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই সংস্করণটি ছাপা হয়েছিল। এই বিশেষ মুদ্রণটি ১৭৭৬ সালের ১৬ থেকে ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক্সেটার শহরে ছাপানো হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্তর আমেরিকার তেরোটি উপনিবেশের ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া। জাতীয় আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, এই ‘এক্সেটার মুদ্রণ’ সংস্করণের এখন পর্যন্ত মাত্র ১১টি কপি টিকে আছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পাওয়া এটিই একমাত্র কপি, যা এই আবিষ্কারের গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

গবেষক আমান্ডা বেভান এই দলিলটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক নতুন দিক উন্মোচন করেছেন। তিনি জানান, নথিটি এমন একটি জাহাজ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে যা আমেরিকার নতুন গঠিত কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের অনুমতিপ্রাপ্ত ছিল। সেই অনুমতিপত্রে কংগ্রেসের সভাপতি জন হ্যানককের স্বাক্ষর থাকা বিষয়টি এই দলিলকে আরও বেশি প্রামাণিক করে তুলেছে। ইতিহাসে সাধারণত স্থলযুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের গৌরবগাথা বেশি আলোচিত হয়, কিন্তু সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছিলেন, তাদের ভূমিকা প্রায়শই পর্দার আড়ালে থেকে যায়। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল ছিল না; বরং এটি যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম ছিল। জাহাজের অধিনায়কেরা হয়তো নিয়মিত নাবিকদের সামনে এটি পাঠ করে তাদের মনে করিয়ে দিতেন যে, তারা কেন লড়াই করছেন এবং কোন নতুন আদর্শের জন্য তারা জীবন বাজি রেখেছেন।

ডালটন জাহাজটি ছিল আঠারোটি কামানযুক্ত একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইভেটিয়ার জাহাজ। কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের অনুমোদনে এটি স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। ১৭৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর পর্তুগাল উপকূলের কাছে ব্রিটিশ রয়্যাল নৌবাহিনীর চেষট্টিটি কামানযুক্ত এইচএমএস রিজনেবল জাহাজ দীর্ঘ সাত ঘণ্টা ধাওয়ার পর ডালটনকে আটক করে। সেই জাহাজের ১২০ জন নাবিককে ইংল্যান্ডের প্লাইমাউথে বন্দি করে রাখা হয়। তাদেরই একজন ছিলেন ১৯ বছর বয়সী চার্লস হেবার্ট। তার লেখা ডায়েরি থেকে জানা যায়, কারাগারে ক্ষুধা, অসুস্থতা ও কঠোর শাস্তির মধ্যেও তাদের মনোবল ভেঙে পড়েনি। দীর্ঘ দুই বছর কারাবাসের পর বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া নাবিকদের এই বীরত্বগাথা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

এই আবিষ্কারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার মিউজিয়াম অব দ্য আমেরিকান রেভল্যুশনের পরিচালক ম্যাথিউ স্কিক। তিনি এটিকে শুধুমাত্র একটি পুরনো কাগজের টুকরো হিসেবে দেখতে নারাজ। তার মতে, এটি ডালটন জাহাজের অধিনায়কের সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সরাসরি সম্পর্কের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি বিশ্বাস করেন, স্বাধীনতার যুদ্ধের ২৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও ইতিহাসের এমন অনেক অধ্যায় এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে। ভবিষ্যতেও হয়তো এমন আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল খুঁজে পাওয়া যাবে, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের লড়াই ও ত্যাগের কাহিনিকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করবে।

পরিশেষে, মাইকেল স্কারের এই দৈব ঘটনাজাত আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় নয়, বরং ধুলোমাখা নথিপত্র আর হারানো উপকরণের মাঝেও বেঁচে থাকে। এই ঘোষণাপত্রটি একদিকে যেমন বিপ্লবের শিখা প্রজ্বলিত রেখেছিল, অন্যদিকে তা নাবিকদের মনে এক নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল। যুক্তরাজ্যের আর্কাইভে খুঁজে পাওয়া এই দলিলটি এখন আধুনিক প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, স্বাধীনতা কেবল যুদ্ধের ময়দানেই অর্জিত হয় না, বরং এটি অর্জনের জন্য প্রয়োজন এক অটল আদর্শ আর সেই আদর্শকে ধারণ করার মতো সাহসী হৃদয়ের। এই ঐতিহাসিক নিদর্শন এখন নতুন করে আমাদের সেই উত্তাল ১৭৭৬ সালের স্মৃতি রোমন্থন করার সুযোগ করে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত