প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পৃথিবীর জলবায়ু এখন এক ভয়াবহ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে যে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা ‘এল নিনো’-কে। জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সতর্কবার্তা জারি করেছে যে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এল নিনো তার চরম শক্তিশালী রূপ ধারণ করতে পারে। এই সংকেতটি বিশ্বব্যাপী পরিবেশবিদ ও নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে, কারণ এর প্রভাব কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সারা বিশ্বের জনজীবন, কৃষি ও অর্থনীতির ওপর এক সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং এর স্থায়িত্ব সাধারণত নয় থেকে বারো মাস পর্যন্ত হয়ে থাকে। ডব্লিউএমওর সর্বশেষ মৌসুমি পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলীয় অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ এবং বায়ুচাপের স্বাভাবিক ছন্দ পুরোপুরি বিঘ্নিত হচ্ছে। ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এল নিনোর তীব্রতা বৃদ্ধির অর্থ হলো বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বিধ্বংসী ভারী বৃষ্টিপাত এবং স্থল ও সমুদ্র উভয় ক্ষেত্রেই তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়া।
গত ২০২৩ সাল ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম বছরগুলোর একটি এবং ২০২৪ সাল সেই উষ্ণতার রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর পেছনে এল নিনোর প্রভাব অত্যন্ত সক্রিয় ছিল।虽然 এল নিনোর সর্বোচ্চ প্রভাব সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অনুভূত হয়, তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা এমনিতেই বৃদ্ধির পথে রয়েছে। এই বাড়তি উষ্ণতা এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট চরম আবহাওয়াকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে যে ঘটনাগুলো আগে স্বাভাবিক মনে হতো, এখন সেগুলোই বিধ্বংসী রূপ ধারণ করছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বিশ্বের জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে, যা মানবস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
এই জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে ভয়ের জায়গা হলো এর অসম প্রভাব। পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মতো কিছু এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকলেও, ভারতীয় উপমহাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হতে পারে। বৃষ্টিহীনতা বা অনাবৃষ্টির সরাসরি আঘাত পড়বে কৃষিখাতে। খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে তা বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করবে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বাড়বে বাড়তি চাপ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিটি দেশ ও অঞ্চলকে এখন থেকেই দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে বলে ডব্লিউএমও জরুরি আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোকে এখন তাদের কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু-সংবেদনশীল পরিকল্পনা আরও জোরদার করতে হবে। উন্নত মৌসুমি পূর্বাভাস এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। এল নিনো কোনো মানুষের সৃষ্টি করা ঘটনা নয়, এটি প্রকৃতির নিজস্ব এক প্রক্রিয়া, কিন্তু মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই প্রাকৃতিক ঘটনা এখন আর আগের মতো সহনীয় পর্যায়ে নেই। সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এল নিনোর শক্তিকে ক্রমাগত বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও এল নিনোর তীব্রতা বৃদ্ধির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রমাণের বিতর্ক এখনো বিদ্যমান, তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এই বিপর্যয়গুলোকে অনেক বেশি তীব্র ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
মানবতা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিনের খবরে আমরা দেখি কোথাও দাবদাহে প্রাণ যাচ্ছে মানুষের, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে জনপদ। এই চরম আবহাওয়া এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং এটি বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা। জাতিসংঘের এই সতর্কতা কেবল একটি প্রশাসনিক বার্তা নয়, বরং এটি পুরো পৃথিবীর জন্য একটি সম্মিলিত জাগরণ। আমাদের সচেতন হতে হবে, পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পৃথিবীকে শীতল করার প্রচেষ্টায় আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। এল নিনোর মতো জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলায় একক কোনো দেশের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বিশ্বজুড়ে সম্মিলিত ও কার্যকর উদ্যোগ।
পরিশেষে বলা যায়, প্রকৃতি তার নিয়ম মেনেই চলে, কিন্তু সেই নিয়মকে যখন আমরা আমাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভারসাম্যহীন করে তুলি, তখন তার খেসারত দিতে হয় পুরো বিশ্বকে। শক্তিশালী এল নিনো কেবল একটি আবহাওয়া পূর্বাভাস নয়, এটি আমাদের পৃথিবীর পরিবর্তনের এক বার্তা। এই সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের জীবনধারা ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করার পথে হাঁটতে হবে। আগামীর পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য রাখতে হলে এখন থেকেই দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। প্রকৃতির সাথে লড়াই করে জেতা কঠিন, কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বুঝে তার সাথে মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকাটা আমাদেরই দায়িত্ব। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই চরম সতর্কতাকে কতটা গুরুত্বের সাথে নিয়ে আসন্ন দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।