ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ফোনালাপ: দ্রুত সাক্ষাতের প্রস্তুতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৩ বার
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ফোনালাপ: দ্রুত সাক্ষাতের প্রস্তুতি

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত ও জটিল প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্ক। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের বিশেষ মুহূর্তে দুই নেতার মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি ফোনালাপ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত এই ফোনালাপে দুই নেতা পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে সশরীরে সাক্ষাতের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের নানা টানাপোড়েন ও শীতল সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে কোনো আনুষ্ঠানিক সফরে যাননি। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণে দুই মিত্র দেশের সম্পর্কে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেশ কিছু তিক্ততার ছাপ স্পষ্ট হয়েছিল। তবে এই ফোনালাপ সেই তিক্ততাকে ছাপিয়ে সহযোগিতার নতুন একটি পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কথোপকথনের সময় নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বৈশ্বিক স্বাধীনতার রক্ষাকর্তা’ হিসেবে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেন এবং দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর পুনরায় জোর দেন। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কণ্ঠেও ছিল ভিন্ন সুর। সাম্প্রতিক এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, আমরা একসঙ্গে খুব ভালো কাজ করেছি। আমি বিবিকে খুব পছন্দ করি। আমি একজন যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রপতি এবং তিনি একজন যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী।

তবে সম্পর্কের এই নতুন সমীকরণ আসার আগেই পরিস্থিতি সব সময় এমন মসৃণ ছিল না। গত ১ জুন লেবাননে পরিচালিত সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ‘পুরোপুরি পাগল’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র সেই সময় জানিয়েছিল, ট্রাম্প তখন নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, তিনি পাশে না থাকলে নেতানিয়াহুকে হয়তো কারাগারে যেতে হতো এবং ইসরায়েল আজ যে বিশ্বব্যাপী ঘৃণার শিকার হচ্ছে, তার পেছনে প্রধানমন্ত্রীর নীতিই দায়ী। পরবর্তী সময়ে ‘দ্য পোস্ট’ পত্রিকার কাছে ট্রাম্প নিজে স্বীকার করেছিলেন যে, উত্তেজনার বশবর্তী হয়েই তিনি এমন কড়া ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। এই ঘটনার পর গত ৮ জুন অপর এক ফোনালাপে ট্রাম্প কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, তেহরানের সঙ্গে যদি কোনো পক্ষ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করে, তবে ইসরায়েল মার্কিন সমর্থন হারাতে পারে। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সেই চরম উত্তেজনা কিছুটা কমে এসেছে এবং দুই নেতার মধ্যকার এই সাম্প্রতিক ফোনালাপ সেই সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখছে।

কূটনৈতিক উত্তেজনার বাইরেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়েও অস্বস্তিতে ছিলেন নেতানিয়াহু। গত বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক টাইমসে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি আলোচনার সময় ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ আলোচকদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল। এই প্রতিবেদনকে নেতানিয়াহু শুরু থেকেই ‘সম্পূর্ণ ভুয়া খবর’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত নিজের বিবৃতিতে তিনি একে ‘বাস্তবতার সম্পূর্ণ মনগড়া বিবরণ’ হিসেবে অভিহিত করেন। মূলত যুদ্ধের এই চরম অস্থিরতার সময়ে যেকোনো ভুল তথ্য বা প্রতিবেদন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে ইসরায়েলি সরকার মনে করছে। আঞ্চলিক গোয়েন্দা তথ্য বলছে, গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে যখন প্রথম দফায় আলোচনার সূচনা হয়, তখন ইরানি প্রতিনিধিদল নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছিল। সেই সংকটের মুহূর্তে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিশেষ নিশ্চয়তা ইরানকে আলোচনায় বসতে সহায়তা করেছিল।

শুক্রবারের ফোনালাপের পর হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া না হলেও বিষয়টি যে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তা নিশ্চিত। তবে ইসরায়েলের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ের নানা মতবিরোধ বা তিক্ততা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের মিত্রতা এখনো মজবুত। দুই নেতার সশরীরে সাক্ষাতের সিদ্ধান্তটি সেই সম্পর্কের গভীরতাকে আবারও দৃশ্যমান করছে। বিশ্বনেতারা এখন তাকিয়ে আছেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আসন্ন সেই বৈঠকের দিকে। এই বৈঠক শুধু দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের মেরামতেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে চলমান সংকট নিরসনে কোনো বড় ধরণের নতুন কৌশল নির্ধারণ করতে পারে কি না, তা নিয়েও জল্পনা-কল্পনা বাড়ছে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুদ্ধ এবং শান্তির মধ্যে যে সূক্ষ্ম রেখা বিদ্যমান, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই ফোনালাপ সেই রেখাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। একদিকে যখন যুদ্ধের ময়দানে প্রাণহানি ও অস্থিরতা চলছে, অন্যদিকে তখন কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে যুদ্ধের দামামা থামানোর চেষ্টাও সমান্তরালভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুই প্রভাবশালী নেতার বৈঠক বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ চিত্রপটে বড় ধরনের পরিবর্তনের নিয়ামক হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সশরীরে সাক্ষাতের পর তারা বর্তমান সংকটের কোনো টেকসই সমাধান নিয়ে সামনে আসতে পারেন কি না। শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় থাকা বিশ্ববাসী এখন সেই বৈঠকের চূড়ান্ত পরিণতির অপেক্ষায় রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত