গম রপ্তানিতে বড় উত্থান, বিশ্ববাজারে আর্জেন্টিনার জয়যাত্রা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার
গম রপ্তানিতে বড় উত্থান, বিশ্ববাজারে আর্জেন্টিনার জয়যাত্রা

প্রকাশ: ০৪ জুলাই   ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম বড় ভিত্তি ছিল রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আসা গম। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের দামামা বিশ্ববাণিজ্যের গতিপথ বদলে দিয়েছে, যার বড় ধরনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের গম আমদানির পরিসংখ্যানে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো রাশিয়া ও ইউক্রেনকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের গম আমদানির প্রধান উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা। এই পরিবর্তনটি কেবল পরিসংখ্যানের হেরফের নয়, বরং দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এক বড় ধরণের বৈচিত্র্য ও কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে সর্বকালের সর্বোচ্চ ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। আর এই বিশাল আমদানির একটি বড় অংশ, প্রায় ৩০ শতাংশ বা ২২ লাখ টন এসেছে সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে।

একসময় বাংলাদেশের গম আমদানির সিংহভাগ আসত কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। কিন্তু ২০২২ সালে যুদ্ধের শুরুর পর থেকেই সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়া, বিমা খরচ বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে মূল্যের অস্থিরতা আমদানিকারকদের বাধ্য করে বিকল্প উৎস খুঁজতে। এই সন্ধিক্ষণেই আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য এক নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে সামনে আসে। এনবিআরের সর্বশেষ হিসাবে, বিদায়ী অর্থবছরে আর্জেন্টিনা থেকে ২২ লাখ টন গম আনতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। মজার বিষয় হলো, আগে যেখানে গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠান আর্জেন্টিনা থেকে গম আনত, গত অর্থবছরে ৪৬টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দেশটির সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়িয়েছে। ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের বদলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

আর্জেন্টিনার এই উত্থানের বিপরীতে রাশিয়ার অবস্থান এখন বেশ সংকুচিত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে মোট আমদানির ৪৪ শতাংশ এসেছিল রাশিয়া থেকে, গত অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩ শতাংশে বা ১৬ লাখ ৭৯ হাজার টনে। এই পতনটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশের আমদানিকারকরা এখন আর কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করতে রাজি নন। তবে ব্রাজিলও তাদের অংশীদারিত্ব বাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত অর্থবছরে ব্রাজিল থেকে ৪ লাখ ৭৬ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা মোট আমদানির প্রায় ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সব দেশের চেয়ে ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গমের দাম ছিল সবচেয়ে কম—টনপ্রতি মাত্র ২৫৫ ডলার। যদিও দামের দিক থেকে ব্রাজিল সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, তবুও আর্জেন্টিনা যেভাবে বড় পরিসরে বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তাতে ব্রাজিল কিছুটা পিছিয়েই রয়েছে।

উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ শক্ত গমের চাহিদার ক্ষেত্রে কানাডা এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রথাগতভাবে দেশের ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ কানাডা হওয়ার কারণে গত অর্থবছরে সেখান থেকে ১৬ লাখ ৭০ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যা মোট আমদানির প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। কানাডা এখন বাংলাদেশের গম আমদানির বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত রেখেছে। তবে গত কয়েক বছরের দীর্ঘ বিরতি ভেঙে বাংলাদেশের গমের বাজারে আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭ লাখ ৪৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই সরকারিভাবে আনা হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে এই আমদানির ফলেই যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের শূন্য থেকে উঠে এসে চতুর্থ বৃহত্তম উৎসে পরিণত হয়েছে।

এই আমদানির চিত্র থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এখন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছেন। আগে যেখানে মাত্র দুটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছিল, এখন সেখানে আর্জেন্টিনা, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ায় সরবরাহের ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং যুদ্ধের উত্তাপ এখনো বাংলাদেশের গম আমদানিকে প্রভাবিত করছে ঠিকই, কিন্তু আমদানিকারক ও সরকার উভয়েই এখন বিকল্প বাজার নিশ্চিত করার মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানির উৎসের বৈচিত্র্য শুধু বর্তমান সময়ের দাবি নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত। যখন একটি দেশের প্রধান খাদ্যশস্যের বড় অংশ বাইরে থেকে আসে, তখন বিশ্ববাজারের যে কোনো ছোটখাটো অস্থিতিশীলতা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষা আমাদের শিখিয়েছে যে, নির্দিষ্ট কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীলতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আর্জেন্টিনা ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে বর্তমানের এই নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক সেই ঝুঁকি লাঘবে অনেকটা সাহায্য করেছে। তবে আমদানিকারকদের এখন আন্তর্জাতিক দামের পাশাপাশি শিপিং খরচ ও মুদ্রার বিনিময় হারের দিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে, কারণ এর ওপরই নির্ভর করছে দেশের বাজারে গমের দাম কতটা সহনীয় থাকবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গম আমদানির বাজার এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। প্রথাগত উৎসগুলোর বাইরে নতুন নতুন দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল বৈচিত্র্যই আনছে না, বরং বিশ্ববাজারে নিজের দরকষাকষির সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে। আর্জেন্টিনার শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এখন বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। আগামীর দিনগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে কি না, তা অনিশ্চিত; কিন্তু বিকল্প উৎসের এই বৈচিত্র্য আমাদের দেশের খাদ্যের যোগানকে অনেক বেশি সুরক্ষিত ও স্থিতিশীল রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও খাদ্য বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত