প্রকাশ: ৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে শনিবার সকালের একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, যাতায়াতের নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর এলাকায় ঘটে যাওয়া বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত সাতজন যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাটি শুধু যানবাহন দুটির সামনের অংশই দুমড়ে-মুচড়ে দেয়নি, বরং যাত্রী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মনে এক গভীর শোক ও আতঙ্কের কালো ছায়া ফেলে দিয়েছে। আহতদের আর্তনাদ আর দুর্ঘটনাকবলিত যানের বিকট শব্দে সকালের শান্ত বাতাস যেন বিষাদে ভারী হয়ে উঠেছিল।
ঘটনাসূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে বরগুনার পাথরঘাটাগামী ‘আলিফ পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছিল। মহাসড়কের বাটাজোর নামক স্থানে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রাকের সাথে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সংঘর্ষটি এতই প্রচণ্ড ছিল যে, স্থানীয় বাসিন্দারা বিকট শব্দ শুনতে পান। বাস ও ট্রাকের সম্মুখভাগ দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার ওপর পড়ে যায়। বাসে থাকা অসংখ্য যাত্রী দুর্ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। বাসের ভেতরে আটকা পড়া যাত্রীদের আর্তনাদ আর বাঁচার আকুতি পথচারীদের শিহরিত করে তোলে। বিশেষ করে ট্রাকের চালক ও তার সহকারীর অবস্থাও আশঙ্কাজনক ছিল। ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পেরে স্থানীয় লোকজনই সবার আগে এগিয়ে আসেন এবং উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে যাতায়াতকারী হাজারো মানুষের কাছে এই সড়কটি এখন যেন আতঙ্কের নাম। প্রায়শই এখানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে, যার পেছনে দায়ী থাকে দ্রুতগতি, চালকের অসতর্কতা কিংবা রাস্তার অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা। দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পরপরই গৌরনদী ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। উদ্ধারকারী দল স্থানীয়দের সহায়তায় বাসের ভেতর থেকে আহতদের বের করে আনেন এবং তাদের দ্রুত গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেন। আহতদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব না হলেও তাদের অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে, তারা গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। বিশেষ করে বাসযাত্রী এবং ট্রাকের চালক ও হেলপারের শারীরিক অবস্থা চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
গৌরনদী হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোহসীন দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, দুর্ঘটনা কবলিত ভারী যান দুটি সরিয়ে নেওয়ায় বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টির তদন্ত করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, গতিসীমা লঙ্ঘন অথবা চালকের কোনো ধরনের অন্যমনস্কতা এই ভয়াবহ সংঘর্ষের মূল কারণ হতে পারে। মহাসড়কে ছোট-বড় যান চলাচলের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় না রাখলে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।
এই দুর্ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন যারা কর্মস্থল বা জরুরি কাজে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন, তাদের মনে এখন স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে। একটি দেশের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলো মহাসড়ক, কিন্তু সেই মহাসড়ক যদি নিরাপদ না হয়, তবে উন্নয়ন আর স্বাচ্ছন্দ্য সবই অর্থহীন। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা সুস্থ হয়ে উঠবেন কি না, তাদের পরিবারের সদস্যরা এখন সেই উদ্বেগে প্রহর গুনছেন। এই ধরনের দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের নয়, বরং পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেয়। আহতদের চিকিৎসার জন্য যে সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, সেখানে তাদের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় সবটুকু সেবাই নিশ্চিত করা হচ্ছে।
মহাসড়কে চলাচলের সময় চালকদের সচেতনতার অভাব এবং রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। যদিও কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে সড়ক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তারা সর্বদা তৎপর, কিন্তু বাস্তবে দুর্ঘটনার হার আমাদের অন্য কথাই বলছে। চট্টগ্রাম থেকে পাথরঘাটাগামী বাসটির যাত্রা নির্বিঘ্ন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মাঝপথে এই সংঘর্ষ তাদের যাত্রাপথকে যন্ত্রণাময় করে তুলল। আমরা প্রতিনিয়ত সড়ক নিরাপত্তার কথা বলি, কিন্তু মহাসড়কে চালকদের বেপরোয়া মনোভাব যেন থামছেই না। সিগন্যাল অমান্য করা, অতিরিক্ত গতির প্রতিযোগিতা এবং মহাসড়কের মোড়গুলোতে সতর্কতার অভাবই মূলত এই ধরণের দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
পরিশেষে বলা যায়, দুর্ঘটনায় আহত সাতজন যাত্রী কেবল পরিসংখ্যানের নম্বর নন, তারা প্রতিটি পরিবারের একেকটি মূল্যবান সম্পদ। এই দুর্ঘটনায় তাদের যে কষ্ট ও ভোগান্তি, তার দায়ভার কে নেবে? মহাসড়কের প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে কোনো না কোনো নিয়ম ভঙ্গের ইতিহাস থাকে। যদি সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ করা যায় এবং চালকদের কঠোর প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যায়, তবেই হয়তো এই সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। আমরা আশা করব, তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা হবে। যারা এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি এবং আশা করি সড়কটি আবার নিরাপদ হয়ে উঠবে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য।