প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণ এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ভারত। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও প্রযুক্তিগতভাবে আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে ভারত সরকার প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা মূল্যের নতুন সামরিক সরঞ্জাম কেনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। শুক্রবার দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই বড় ধরনের প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সংগ্রহে ভারতের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল’ বা ডিএসি এই বিপুল বিনিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। এই কাউন্সিল দেশটির সামরিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সর্বোচ্চ পর্যায় হিসেবে কাজ করে। সরকারের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এই প্রকল্পের আওতায় ভারত তার স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীকে যুদ্ধের নতুন ধারার উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য ব্যাপক আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। যদিও সরঞ্জামগুলো কবে নাগাদ হাতে পাওয়া যাবে এবং এর কতটুকু বিদেশ থেকে আমদানিকৃত হবে আর কতটুকু ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পে তৈরি হবে—সে বিষয়ে এখনই কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের লক্ষ্য হলো নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ানো।
এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার আওতায় যে সমরাস্ত্রগুলো সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনার অত্যাধুনিক ব্যবস্থা এবং বিশেষভাবে আলোচিত ‘কামিকাজে’ ড্রোন। বর্তমানের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তির গুরুত্ব যে কতটা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে ভারত তাদের স্থলবাহিনীর জন্য ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে। এছাড়া বহনযোগ্য ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং জেটচালিত ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে শত্রুসেনার অবস্থান নিমিষেই ধ্বংস করার সক্ষমতা অর্জন করতে চায় দেশটি। নৌবাহিনীর কথা মাথায় রেখে নতুন ধরনের নৌ-মাইন এবং যুদ্ধজাহাজ থেকে পরিচালনার উপযোগী ড্রোন কেনার ব্যবস্থাও এই বিশাল প্রকল্পের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখা এবং নজরদারির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি বিশেষ পরীক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নিয়েছে নয়াদিল্লি। এছাড়া বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উচ্চ উচ্চতায় দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে উড়তে সক্ষম অত্যাধুনিক চালকবিহীন উড়োজাহাজ বা ইউএভি প্ল্যাটফর্ম সংগ্রহের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সীমান্তে নজরদারি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় শত্রুপক্ষের ওপর ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকার কাজে ব্যবহৃত হবে। নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে ভারত গত কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত आক্রমণাত্মক কৌশল নিয়েছে। বিশেষ করে এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্মান উপস্থিতি ও প্রভাব মোকাবিলায় ভারত তাদের সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর কাজে বিশাল বাজেট বরাদ্দ করেছে। গত ডিসেম্বরে প্রায় ৭৫টি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন তৈরির কার্যক্রম শুরু করা ছিল এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গত এক দশকের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারত তাদের ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী রুশ প্রতিরক্ষা নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি সুকৌশলী প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়া ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ থাকলেও, বর্তমান কৌশলগত প্রয়োজনে নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সাথে সামরিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব জোরদার করেছে। ভারতের বর্তমান প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের মতো, যা দেশটির বৈশ্বিক সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর থেকে ভারত কোনোভাবেই তাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আপস করতে রাজি নয়। সেই অভিজ্ঞতাই বর্তমানের এই ব্যাপক আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ভারত সরকারের এই উদ্যোগ কেবল সমরাস্ত্রের মজুদ বাড়ানোর লড়াই নয়, বরং এর মাধ্যমে দেশটির দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প বা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগকে শক্তিশালী করারও একটি গোপন এজেন্ডা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সামরিক চুক্তি করার পাশাপাশি ভারত এখন নিজস্ব কারখানায় উন্নতমানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতেই প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম কেনার যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ফ্রান্স থেকে রাফাল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ধারাবাহিতা প্রমাণ করে যে, ভারত সরকার তাদের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ছাড়া আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। সাইবার যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং ড্রোন প্রযুক্তির এই যুগে ভারত তার সামরিক বাহিনীকে যে কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে, তা মূলত আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখারই একটি কৌশল। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই বিনিয়োগ অপরিহার্য বলে মনে করছে দেশটির প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্টরা। ভারতের এই ব্যাপক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ এবং সামরিক প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার দিকে তাকিয়ে রয়েছে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো। আগামী দিনগুলোতে ভারত কতটা সফলভাবে এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে এবং তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।